Sunday 24 February

বিতর্ক হোক কুতর্ক মুক্ত

আমরা অনেকেই নানা কারণে নানা বিষয় নিয়ে আমাদের মতামত প্রকাশ করি, তর্ক-বিতর্ক করি। কেউ প্রকাশ করি যুক্তি দিয়ে ভেবে চিন্তে আবার কেউ ধুম করে মুখে যা আসে তাই বলে ফেলি! মুখে যা আসে তা না ভেবে বলাটা একদমই উচিৎ না সেটা সবাই জানি, কিন্তু অনেক সময় কিছু কথা আমরা ব্যবহার করি যা শুনে মনে হবে কথায় যুক্তি আছে কিন্তু আদতে কথাটা কিন্তু মোটেই যুক্তিযুক্ত নয়। এমন কথাকে বলে অযৌক্তিক কথা। আর সেই কথা যদি তুমি কোন বিতর্কে বলো তাহলে যুক্তিবিদ্যার ভাষায় সেটা হবে কুতর্ক বা কুযুক্তি বা হেত্বাভাস। যাকে ইংরেজিতে বলে Logical Fallacy.

ধরো, কেউ তোমাকে বলল, “একটা গ্লাস অর্ধেক পানি দিয়ে পূর্ণ তারমানে গ্লাসটা অর্ধেক খালি। তাইনা?”

তুমি বললে, “হ্যাঁ।”

সে তখন বলল, “এখন একটা গ্লাসের এক চতুর্থাংশ ভর্তি, তারমানে গ্লাসটার এক চতুর্থাংশ খালি!”

কিন্তু আদতে কী তাই? তা তো না। কারণ একটা কিছুর সাথে অন্য আরেকটা কোন কিছুর তুলনা দিতে হলে দুটি জিনিস-ই একে অপরের সমান হতে হবে। সেটা হতে পারে মানে কিংবা গুণে। উপরের উদাহরণে বুঝতেই পারছ কোন একটা গ্লাসকে আমরা ১ ধরলে, গ্লাসটিতে অর্ধেক পানি থাকলে খালি থাকবে (১ - ০.৫) = ০.৫ অংশ। কিন্তু ওই গ্লাসের এক চতুর্থাংশ পানি ভর্তি থাকলে খালি থাকবে (১ - ০.২৫) = ০.৭৫ অংশ। কথায় শুনে এমন যুক্তি গুলোকে হয়ত আমরা ধরতে নাও পারতে পারি, আমাদের মনে হতে পারে যুক্তি গুলো হয়ত ঠিক কিন্তু একটু ভেবে চিন্তা করে দেখলে এমন সব কুযুক্তি গুলো বোঝা যায়। আমাদের আশেপাশের প্রায় সবাইকে এমন কুযুক্তি গুলোকে যুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তাই তোমাদের উচিৎ কুযুক্তি গুলোকে শুধরে দেয়া যাতে কেউ কুযুক্তি দিয়ে তার সুবিধা হাসিল করে নিতে না পারে। আর সেজন্য তোমার অবশ্যই জানা থাকতে হবে কুযুক্তি বা হেত্বাভাস বা লজিক্যাল ফ্যালাসি গুলো কী কী, কিভাবে বিতর্কে এসব ব্যবহার করে লোকজন অসৎ ভাবে বিতর্ক জিততে চেষ্টা করে। তাহলে এসো এখনি জেনে নেয়া যাক-

১। Ad Hominem Fallacy (ব্যক্তিগত আক্রমণের কুযুক্তি): ধরো কেউ একজন তোমার সাথে তর্ক করছেন ‘গণতন্ত্র এবং আমাদের মুক্তি’ এই বিষয় নিয়ে। এখন তুমি যদি গিয়ে বলো, “আপনি এই বিষয় নিয়ে কথা বলছেন কেন? আপনার ভাই তো একনায়কতন্ত্রের সেফাই গায়, আপনার বোন তো চায় সামরিক সরকার এদেশ চালাক ইত্যাদি ইত্যাদি…”

দেখো তুমি গণতন্ত্র নিয়ে তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা না করে তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে নেমে গিয়েছ! এমন যদি হয় তোমার (আমি জানি তুমি এমন না :P) যুক্তি (!) তাহলে সেটাকে বলে Ad Hominem Fallacy.

২। Straw Man Fallacy (নিজের কল্পিত মানুষকে হারানোর কুযুক্তি): আদু ভাইয়ের গল্প পড়েছ না? যিনি দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও ক্লাস সেভেন থেকে ক্লাস এইটে উত্তীর্ণ হতে পারেন নি (মৃত্যুর পরে অবশ্য তাকে পাস করানো হয়েছিল)। কারণটা ছিল তিনি পরীক্ষার খাতায় পরীক্ষার প্রশ্নের উত্তর না লিখে নিজে প্রশ্ন বানিয়ে তার উত্তর লিখে আসতেন! আমাদের এবারের কুযুক্তির ধরণটাও এরকম।

ধরো বক্তা ‘ক’ বলছেন, “আমি ক্রিকেট খেলা পছন্দ করিনা।”

বক্তা ‘খ’ বলছেন, “ ‘ক’ ক্রিকেট খেলা পছন্দ করেন না কারণ হিটলার ক্রিকেট খেলাকে ব্যান করেছিলেন। হিটলার একজন জঘন্য মানুষ, সে অসংখ্য ইহুদীদের হত্যা করেছে। সে একজন উগ্র জাতীয়তাবাদের জ্বলন্ত উদাহরণ ইত্যাদি ইত্যাদি।”

খেয়াল করে দেখো ‘ক’ বক্তা কিন্তু কখনোই বলেননি যে তিনি হিটলারের কারণে ক্রিকেট খেলা পছন্দ করেন না। বক্তা ‘খ’ নিজে নিজে তার মতামত অবৈধ ভাবে বক্তা ‘ক’ এর দিকে চাপিয়ে দিচ্ছেন। বিতর্কের সময় এমন কাজ করাকেই বলা হয় Straw Man Fallacy.

৩। Appeal to Ignorance (অজ্ঞতার কুযুক্তি): ধরো আমাদের সেই আগের বক্তা ‘ক’ তোমাকে বলল, “আমি জনাব ‘খ’ কে চিনিনা কিন্তু তার ছবি দেখেছি। আমি একদম নিশ্চিতভাবে বলে দিতে পারি এইরকম দেখতে লোকেরা জ্ঞানী হয়।”

যেহেতু তুমি জনাব ‘খ’ কে চিনো না, তার সাথে কখনো দেখাও হয়নি বা সে যে আদৌ আছে এমন নিশ্চয়তাও তোমার কাছে নেই যে তুমি তাকে যাচাই করে দেখবে। এমন যুক্তি দেয়াকে বলে Appeal to Ignorance. বক্তা ‘ক’ তোমার কাছে এমন যুক্তি নিয়ে এসেছে যার অকাঠ্য প্রমাণ তাকে দিতে হচ্ছে না বা সে পারবে না জন্যে এমন কিছুকে প্রমাণ হিসেবে নিয়ে আসে যা তুমি যাচাই করে দেখতে পারবেনা। ভেবে দেখো তো তোমার চাপাবাজ বন্ধুটি এই কুযুক্তি দিয়ে কতো চাপাবাজি করে গেছে এতদিন ধরে (আমারও এমন বন্ধু আছে কয়েকজন! L)! অনেক হয়েছে, আর না, তাকে এখনি ধরিয়ে দাও!

৪। Appeal to Authority (পন্ডিতের কুযুক্তি): জনাব ‘ক’ একজন বড় বিজ্ঞানী। তিনি বলেছেন বিবর্তনবাদ ভুয়া! এমন কিছুই ঘটেনি বলেই তার মনে হয়। অতএব, বিবর্তনবাদ ভুল।

আমি যে যুক্তিটি বিবর্তনবাদকে ভুল প্রমাণের জন্য দেখালাম তা একদমই সঠিক পদ্ধতি হয়নি। এর জন্য আমাকে বৈজ্ঞানিক যুক্তি উপস্থাপন করতে হতো। কিন্তু আমি সেটা করিনি। একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি একটা ধারণাকে মেনে নিলে বা বিশ্বাস করলে তাতে সেই ধারণাটি ঠিক বা ভুল কোনটাই প্রমাণিত হয়না। প্রমাণিত করার একমাত্র মাধ্যম হলো যুক্তিতর্ক এবং উপযুক্ত প্রমাণ হাজির করা। কত বড় ব্যক্তি সেটা মানেন বা মানেন না সেটার উপরে না।

৫। Argument from Popularity Fallacy (জনপ্রিয়তার কুযুক্তি): যেহেতু আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষের দৃষ্টিতে ‘অমুক ব্যক্তি’ কাজটি ঠিক করেছে। অতএব, ‘অমুক ব্যক্তি’র কাজটি সঠিক ছিল।

উপরের যুক্তিটিও একটি কুযুক্তি যাকে বলে Argument from Popularity Fallacy. কারণ কতজন মানুষ সন্তষ্ট হলো তার উপরে কখনো যুক্তি নির্ভর করেনা। যেটি যুক্তিতর্কে টিকে থাকবে সেটিই হবে সঠিক কাজ।

যেমনঃ জিওর্দানো ব্রুনো বলেছিলেন পৃথিবী গোল। সূর্য মহাবিশ্বের কেন্দ্র নয়, এটি একটি নক্ষত্র মাত্র। কিন্তু ওই সময়ের বেশিরভাগ মানুষ তা মেনে নেয়নি। তাঁকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছিল! কিন্তু তাই বলে তো আর তখন অধিকাংশের যুক্তি সঠিক ছিল এটি প্রমাণিত হয়নাবরং এমন সিদ্ধান্ত গুলোকে মানব ইতিহাসে নিকৃষ্টতম সিদ্ধান্ত বলে ধরা হয়।

৬। Circular Argument Fallacy (কুযুক্তির দুষ্টুচক্র): প্রথমে দুইটা উদাহরণ দেইঃ

(১) আমি ‘দেবী’ সিনেমাটি দেখতে যাবো কারণ আমার মনে হয় ‘দেবী’ সিনেমাটি বাংলার সেরা সিনেমা।

(২) আমার মস্তিষ্ক বলছে আমার মস্তিষ্ক ঠিক আছে।

উপরের উদাহরণ লক্ষ্য করলে দেখবে একটি দাবী অন্য দাবীকে সত্য প্রমাণ করতে চাইছে। কিন্তু আদতে কোন দাবী-ই কিন্তু প্রমাণিত নয়। এমন চক্রাকারে ঘুরপাক খায় জন্য এসব কুযুক্তি গুলোকে বলে Circular Argument Fallacy.

যাইহোক, আজ আর লেখা বেশি লম্বা করবো না । উপরের ছয়টি পয়েন্ট ছিল কুযুক্তি বা লজিক্যাল ফ্যালাসি নিয়ে প্রথম পর্ব। আরও ৬টি লজিক্যাল ফ্যালাসি নিয়ে আমি রাফিউল কবির রাফি কথা বলব দ্বিতীয় পর্বে। আপনাদের সকলের সুস্থতা কামনা করে আজ এখানেই শেষ করছি। আল্লাহ্‌ হাফেয...smiley

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া, The Best Schools, Nastikya.com এবং ইন্টারনেট

সপ্নঘুড়ির সাথে থাকার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আমাদের পোস্ট গুলো যদি ভালো লেগে থাকে বা ইনফরমেটিভ হয় তাহলে প্লিজ শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সাথে।
"স্বপ্ন দেখুন, স্বপ্ন নিয়েই বাচুন, অন্যের স্বপ্নকে উৎসাহ দিন"