Friday 22 February

নীল সাগরের দেশে – সেন্টমার্টিন

সেই ছোট বেলা থেকেই ভাবতাম পানির তো কোন রঙ হয় না তাহলে সাগরের পানি এতো নীল হয় কেনো!! মাঝ সমুদ্রের ভিডিও দেখতাম আর নিজেকেই প্রশ্ন করতাম! তেমন কোন সূদত্তর খুঁজে পেতাম না! তবেঁ মজার ব্যপার হলো কিছুদিন আগে নিজেই উত্তরটা জেনে আসলাম মহান আল্লাহর আমাদের মাতৃভূমিকে দেয়া সবচেয়ে সুন্দর প্রাকৃতিক উপহার সেন্টমার্টিন  দ্বীপ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে।

আজ বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন ভ্রমন অভিজ্ঞতা নিয়েই কিছু বলবো আর আপনাদের মাঝেও জীবনে একবার হলেও সেন্টমার্টিন ঘুরে আসার জন্য একটা লোভ লাগানোর চেষ্টা করবো!! smileysmiley

সেন্টমার্টিন যাওয়ার পথে আপনাকে এভাবেই সঙ্গ দিবে ঝাকে ঝাকে সাদা গাঙচিল

ছোট বেলা থেকেই আমার এক বাসায় থাকতে বেশী দিন ভালো লাগতো না। প্রাচীন সভ্যতার যাযাবরদের নিয়ে গল্প পড়তাম আর আকৃষ্ট হতাম তাদের জীবনের প্রতি। কিন্তু এই একবিংশ শতাব্দিতে এসে যাযাবর জীবনের স্বাদ পাওয়া সহজ কথা নয়। তাই মাঝে মাঝেই নিজেকেই নিজে ছুটি দিতে বেড়িয়ে পড়ি এদিক সেদিক! তেমনি এবার বেরিয়ে পড়েছিলাম স্বচ্ছ নীল পানির দুনিয়া সেন্টমার্টিনে

কক্সবাজারে এতো এতো পর্যটকের ভিড়ে যারা সমুদ্রের প্রকৃত স্বাদ নিতে পারেন না তাদের জন্যই সেন্টমার্টিন একেবারে উপযুক্ত জায়গা। এখানে নেই কোলাহলের ছাপ, কেবল মৃদু বাতাসে নোনা পানির গন্ধ, আকাশ আর পানি নীল রঙের পসারা সাজিয়ে আপনাকে করে তুলবে উদাস।

সেন্টমার্টিন দ্বীপটির আয়তন প্রায় ১০-১৫ বর্গ কিলোমিটার। দ্বীপের উত্তর পাশকে নারিকেল জিঞ্জিরা বলা হয়। মাঝে দ্বীপের সবচেয়ে সরু স্থান গলাচিপা বলে ডাকে সবাই যেখানে পূর্ব এবং পশ্চিম দুই পাশের সমুদ্রের গর্জন শোনা যায়। এবং সর্ব দক্ষিনে আছে ছেড়াদিয়া বা ছেঁড়াদ্বীপ।  যেখান থেকে নেমে হাতের বাম পাশ ধরে হাটতে থাকলে পেয়ে যাবেন ছেড়াদ্বীপ, মাঝে পড়বে দ্বীপের সবচেয়ে সরু অংশটি যাকে গলাচিপা বলে। আর এখান থেকে ডান পাশ ধরে হেটে গেলে পাবেন পশ্চিম বীচ বা নারিকেল জিঞ্জিরা, যেখানে সবাই গোসল করে।

সেন্টমার্টিন নিয়ে আসলে লিখে শেষ করে যাবে না, এর সাথে বাড়তি পাওনা ছেড়া দ্বীপ। জোয়ারের সময় সেন্টমার্টিন থেকে একটি অংশ আলাদা হয়ে যায় বলে একে ছেড়া দ্বীপ বলে। ছেড়া দ্বীপের একেবারে শেষ মাথায় পাথরের উপর বসে সমুদ্রের গর্জন শুনার অভিজ্ঞতা আপনার আজীবন মনে থাকবে।

রেগুলার বোরিং লাইফের প্যরা থেকে মুক্তি পেতে তাই ২টি দিনের জন্য ঘুরে আসতে পারেন সেন্টমার্টিন থেকে। সেন্টমার্টিন দ্বীপে গিয়ে কি কি করবেন, কি কি দেখবেন আর কি কি খাবেন তার ব্যপারে কিছু বলছি এবার-

কি কি দেখবেনঃ

১। উত্তর পাশের নারিকেল জিঞ্জিরা (জেটি থেকে বাম পাশের বিচ ধরে হাঁটলেই পাবেন)
২।  পশ্চিম পাশের কোরাল দ্বীপ
৩। জেটি ঘাট (সকালে সমুদ্রের পানির রঙ থেকে অবাক হয়ে যাবেন এখানটায়, একেবারে ঘাড় নীল। আর রাতে জেটির সিঁড়িতে বসে সমুদ্রের গর্জন শুনতে ভুলবেন না।
৪। গলাচিপা
৫। ছেঁড়াদ্বীপ
৬। পশ্চিম বিচে বসে সূর্যাস্ত
৭। জেটিঘাটে বসে সূর্যোদয়
৮। রাতের পরিষ্কার আকাশে লক্ষ লক্ষ তারা
৯। সমুদ্র বিলাস (হূমায়ুন আহমেদের বাড়ি)
১০। বিকালে জেটির বাম পাশের বিচে জেলেদের জাল টেনে মাছ ধরা
১১। বাজার থেকে পাকা রাস্তা ধরে হেঁটে অবকাশ হোটেল পর্যন্ত স্থানীয়দের বাসস্থান, জীবন ধারা
১২। সন্ধ্যা/রাতে বাজার

শামুকে ঘেরা সামুদ্রিক প্রবাল

কি কি করবেনঃ

১। সাইকেল চালানো
২। হেঁটে/স্পিডবোট/মাছ ধরার ট্রলার/লাইফবোটে ছেঁড়াদ্বীপ যাওয়া
৩। নানা ধরনের মাছের বার বি কিউ খাওয়া

৪। খুব ভোরে উঠে জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনা
৫। বিকেলে জেলেদের সাথে জাল টেনে মাছ ধরা,ভাগ্য ভালো হলে ফ্রি মাছও পেয়ে যেতে পারেন
৬। ক্যাম্প ফায়ার করা
স্কুবা ড্রাইভিং করা

কি কি খাবেনঃ

১। মাছের বারবিকিউ (ছোট বড় সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ খেতে পারেন, বাজারে সব ধরনের মাছ সাজিয়ে রাখা হয়, আমরা খেয়েছিলাম কোরাল মাছ, মজা পেয়েছি অনেক)

সুস্বাদু কোরাল মাছের বার-বি-কিউ। কেউ মিস করবেন না কিন্তুlaugh

গাছ থেকে পেড়ে কচি ডাব খেতে পারবেন স্থানীয়দের সাথে কথা বলে ৪০ থেকে ৬০ টাকা দামের ভিতর

প্রচুর সামুদ্রিক মাছ পাবেন সেগুলোর ভাজা খাবেন , সী বীচের পাড়ে বসেই পায়ের উপর পা তুলে সমুদ্র বিলাস সাথে মাছের ফ্রাই, অস্থির মজাwink

কিভাবে যাবেন সেন্টমার্টিনঃ

ঢাকা অথবা দেশের যে কোন জায়গা থেকে আপনাকে যেতে হবে প্রথমে টেকনাফ। টেকনাফ থেকে জাহাজে করে সেন্টমার্টিন দ্বীপে। টেকনাফ থেকে সকাল ৯.৩০টার অথবা ১০টার জাহাজে করে সেন্টমার্টিন। সেন্টমার্টিনে যতদিন ইচ্ছা থেকে আবার বিকাল ৩টার জাহাজে করে টেকনাফ। টেকনাফ থেকে বাসে করে নিজ নিজ বাসস্থান।
প্রতিদিন সকাল বেলা টেকনাফ থেকে ৩-৪ টি জাহাজ
সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে যায় আবার সেন্টমার্টিন থেকে দুপুর ৩টায় টেকনাফের উদ্দেশ্যে জাহাজ গূলো ছেড়ে আসে।

কিভাবে যাবেন ছেঁড়া দ্বীপঃ

ট্রলার রিসার্ভ করে দল বেধে যাওয়া যায় যে কোন সময়ে।

ভাটার সময়ে হেটে অথবা সাইকেলে যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে স্থানীয়দের থেকে অবশ্যই জোয়ার-ভাটার সময় জেনে নিবেন ।

কোথায় থাকবেনঃ

সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের থাকার সুবিধায় এখন অগণিত হোতেল আর রিসোর্ট গড়ে উঠেছে তাই থাকা নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। চাইলে যাওয়ার আগেই কোন হোটেলে বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন, একটু গুগলে খুজলেই অনেক হোটেল পেয়ে যাবেন। তবেঁ আমার মতে ওখানে গিয়ে হোটেল দেখে বুক দেয়াই ভালো, এতে খরচ অনেক কমবে। সেন্টমার্টিনে আপনি রুম আকারে ৫০০ থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত দামের রুম পাবেন।

কিছু পরামর্শঃ

  • সবসময়য় সমুদ্র এবং সেন্টমারটিন দ্বীপটাকে পরিষ্কার নিজেও রাখবেন এবং অন্যাকেও এ ব্যপারে উৎসাহিত করবেন। নির্দিষ্ট জায়গায় দয়া করে ময়লা ফেলবেন।
  • দ্বীপ থেকে প্রবাল নিয়ে আসবেন না। এভাবে সবাই যইদি ১টী-২টি প্রবাল নিয়ে আসি তাহলে একদিন প্রবাল গুলো ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে।sad
  • স্থানীয় মানুষদের সাথে ভালো ব্যবহার করুণ তবেঁ দালাদদের এড়িয়ে চলবেন।

হাতের মুঠোয় সেন্টমারটিনের সূর্যাস্ত

 

এই ছিলো আপনাদের জন্য সপ্নঘুড়ি টিমের সেন্টমার্টিন এর ইতিকথা। আরো কিছু জানতে প্রয়োজন মনে হলে আমাদের ফেসবুক পেইজে মেসেজ করতে পারেন আমাদের। একজন ভ্রমনপিপাসু মানুষ হিসেবে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করবো আপনাদের তথ্য দিয়ে সহযোগীতা করার জন্য।

সপ্নঘুড়ির সাথে থাকার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আমাদের পোস্ট গুলো যদি ভালো লেগে থাকে বা ইনফরমেটিভ হয় তাহলে প্লিজ শেয়ার করুন আপনার বন্ধুদের সাথে।
"স্বপ্ন দেখুন, স্বপ্ন নিয়েই বাচুন, অন্যের স্বপ্নকে উৎসাহ দিন"