Wednesday 29 November

অনিন্দ্য সুন্দরী সুপ্তধরা ঝর্না, সীতাকুণ্ড, চট্রগ্রাম

প্রকৃতি প্রেমী রা বরাবরই প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যেতে নান জায়গায় ঘুরতে যায় আর ঝর্ণা স্পট গুলো বরাবরই তাদের কে চুম্বকের মতো টানে সেই টানে এবার আমি , উচ্ছ্বাস, রানা , সায়েম ভাই সীতাকুন্ড অঞ্চলের ঝর্ণার প্রেমে পড়তে আসলাম
সুপ্তধরা এই ঝর্ণা টি সীতাকুণ্ড ইকো পার্কের ভিতরে অবস্থিত। ইকো পার্কের গেট থেকে হাটার পথ প্রায় ৩ কিঃমিঃ ।  দুপুরের দিকে দল সহ টিকেট কেটে ঢুকে গেলাম ইকো পার্কের ভিতর। প্রথম দেখাতেই একটু ভিন্নতা চোখে পড়লো এই ইকো পার্কের । যথেষ্ট পরিস্কার সব কিছু। এক সাইডে নজরুল ইসলামের একটি ভাস্কর্য আর বা পাশ দিয়ে পথ উঠে গেছে উপরের দিকে । কিছু সি এন জি ওয়ালা মামারা ট্রাই করলো তাদের সি এন জি তে উঠানোর জন্য আমাদের কে । যথেষ্ট টায়ার্ড ছিলাম আমরা তখন। তবু ভাবলাম যুবক বয়সেই যদি হাটতে না পারি তবে আর কবে ! আর ভিতরের রাস্তা গুলো খুব টানছিলো আমাদের আর যেন বলছিলো , আমাদের পদচিহ্ন ফেলে যেতে তার বুকে ! হাটার যাত্রা শুরু হলো সুপ্তধারা ঝর্ণার দিকে ।
আসলেই এই ইকো পার্ক টি একটু ভিন্ন। একেবারে সুনসান নিরবতা । আর পথ গুলো মাশা আল্লাহ পেচিয়ে পেচিয়ে উঠে গেছে উপরের দিকে । আস্তে আস্তে পা ধরে আসতে থাকলো । পথিমধ্যে গোলাপ বাগান দেখলাম যদিও কোন গোলাপ দেখি নি গাছে। রাস্তার মাঝে একটি সাপ কেও দেখলাম রোদে মনে হয় গা শুকাচ্ছিলো, আমাদের দেখে ঝোপের আড়ালে লুকালো। প্রায় ২ কিঃমিঃ হাটার পর পথের একটা উঁচু জায়গায় সাইনবোর্ড দেখলাম সুপ্তধরা ঝর্ণার । একটা তীর চিহ্ন দিয়ে ডান পাশের   সিড়ি বাধানো পথ দেখিয়ে দেওয়া আছে ।
এবার ঢালু সিড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করলাম। উত্তেজনায় লাফিয়ে লাফিয়ে নামছিলাম । প্রায় ১০০ ফুট নিচে নাম্বার পরও যখন দেখছি সিড়ি শেষ হচ্ছে না তখন বুঝতে পারলাম রাস্তা ধরে বেশ উপরেই উঠেছি আমরা । তাই পা ধরে গিয়েছিলো । এবার ঝোপঝাড় ঘেরা ছিপা রাস্তার মাঝে ঢুকলাম । বেশ খানিকটা এগুতেই ঝিরিপথ পেয়ে গেলাম। বাট এখানে এসে পথ হারিয়ে ফেললাম। ভাবলাম ঝিরিপথ ধরে এগুবো কিন্তু সামনেই আবার বড় একটা গভীর পানির গর্ত দেখলাম । আমি একটু দৌড়ে আগে চলে এসেছিলাম এ জায়গাটায়। পিছনে তাকিয়ে দেখি উচ্ছ্বাস আসলো কেবল । আশে পাশে উকি ঝুকি মেরে বুঝতে পারলাম ঝিরিপথ টা ক্রস করতে হবে । মোটামুটি স্রোতশীল ঝিরিপথ টা ক্রস করেই ওপাশে পিচ্ছিল মাটির পথ পেয়ে গেলাম । এগুতে থাকলাম নতুন কিছু দেখার আশায় । এ পথে কিছু কামরাঙ্গা গাছ ও দেখলাম । আপনাদের সময় থাকলে খেয়ে নিবেন নিজের গাছ মনে করে ! হাহাহা ...
মাটির পথ টুকু পেরিয়েই আমরা আসল ঝিরিপথ এ পৌঁচে গেলাম। বেশ সুন্দর স্বচ্ছ পানির ঝিরিপথ দেখলাম । পা টা যেন আইসল্যান্ডের মাঝে চুবালাম। ফিলিংস টা এমন ছিলো তখন । বেশ সুন্দর ওয়েদার তার মাঝে এমন রোমাঞ্চ !! মনে হলো আসলে আল্লাহর এসব অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য দেখার জন্য হলেও বাঁচার দরকার। স্নিগ্ধ এক অনুভুতি নিতে নিতে এগুতে থাকলাম। বেশিক্ষন হাটতে হলো না। ৮-১০ মিনিট পরেই সুপ্তধরার গর্জন শুনতে পেলাম। মনে হলো কোন মায়াবীনি যেনো ডাকছে আমাদের।
বুক ফুলিয়ে সামনে এসে দাড়ালাম সুপ্তধরার সামনে । কিন্তু এ দেখি ভাবনার থেকেও বেশী সুন্দর ! মুখ যে তার তিনটি ! মানে তিন টা ফোয়ারা থেকে পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে ম্যডামের শরীর বেয়ে ! হা করে গিললাম কতক্ষন তার সৌন্দর্য । আসল ব্যপার তো এখনো বলিই নাই আপনাদের । পুরা সুপ্তধরার মাঝে তখন কেবল আমরা ৪ জন । পুরাই অনাকঙ্খিত একটা ব্যপার ঘটলো । কলম্বাস আমেরিকা আবিষ্কার করেও মে বি এতো টা খুশি হয় নি । আমরা যখন যতটা হয়েছিলাম ।

একটু একটু গা ছম ছম করছিলো ! আর চারপাশ টা বদ্ধ অনেকটা ঝোপঝাড় আর উচু পাহাড় ঘেরা ! তবে মিনিটেড় মাঝেএই ভয় মেশানো অ্যাডবেঞ্চার টাই বেশী ভালো লাগলো  

ক্লিক, ক্লিক ক্লিক । দু- চার খানা ছবি তুলেই জামা কাপড় চেঞ্জ করে ক্যমেরা টা একটা পাথরের উপর বসিয়ে ভো দৌড় ঝর্ণার নিচে। কিন্তু ৩ মুখের এ ঝর্ণা তে কোন মুখ রেখে কোন মুখে আগে গিয়ে শরীর ভিজাবো ভেবে পাচ্ছিলাম না । বা পাষেড় শেষ মুখ টির সামনেই বেশ সুন্দর পাথুরে মেঝে দেখতে পেলাম । একেবারে মনে হয় যেন কেউ আমাদের জন্যই পাথুরে বিছানা বিছিয়ে রেখেছিলো ! আরামসে, চোখ বন্ধ করে শুয়ে গেলাম মঝের উপর । জীবনের সুখকর এক অনুভূতি পেলাম  !

একে একে ৩ রানীর কাছেই গেলাম আমরা । আর পানির প্রেশার যখন পিঠের উপর পড়ছিলো তখন মনে হচ্ছিলো হার্ডকোর মেসেজ করাচ্ছি শরীর । সামনে আবার খানিকটা গভীর গর্ত পেলাম। ছোট বেলার কথা মনে পড়ে গেলো । নদীতে লাফ দেওয়ার কথা। খানিকটা দাপাদাপি করলাম বাচ্চাদের মতো । আসলে এসব জায়গায় গেলে কেওম জানি নিজেকেই নিজে চিনতে পারা যায় না। একটা বাচ্চামি ভাব চলেই আসে ! সৌন্দর্য দেখেই ভ্যবাচেকা খেয়ে যাবেন আপনি!! তখন আপনিও আমাদের সাকিব ভাই এর মতো বলবেন – এত্তো ইয়াম্মি, বেরিয়ে আসে বাচ্চামি !!!

দীর্ঘ ১ ঘন্টার মতো গোসল করলাম আমরা । আর আজিব ব্যপার, এই ১ ঘন্টার মাজে আর কোণ পর্যটক দল এই আসলো না । ততক্ষণে দেরী হয়ে গিয়েছে। যেতে হবে আবার পরবর্তী গন্তব্যে। ফিরার পথে পা বাড়ালাম। আর ঝিরিপথ ধরে কিছু দূর এগুতেই দেখলাম ৬-৭ জনের আরেকটি দল যাচ্ছে ঝর্ণার দিকে । মনে মনে ফিকে হাসলাম আর নিজেদের কে স্পেশাল ভাবতে শুরু করলাম !! হাহাহা, মনে হলো যেন, সুপ্তধরা তার ওপার সৌন্দর্য আমাডেড় কে একান্তেই দেখাতে চেয়েছে তাই পুরো টা সময় সে আমাদের কে একা একা তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে দিয়েছে !!

হাটতে হাটতে সেই আগের সিড়ির কাছে চলে আসলাম । সামনে খাড়া সিড়ি গুলো যেন ব্যঙ্গ করতেছিলো আমদের , আর বলছিলো, ভায়া রা যত সহজে লাফিয়ে লাফিয়ে নামছিলা দেখি এখন উঠো দেখি লাফিয়ে লাফিয়ে !! ভারী হয়ে যাওয়া পা দুটোকে টানতে টানতে উঠতে থাকলাম আমরা । পিছনে রেখে আসলাম নতুন আরেক অভিজ্ঞতা। যেটা কখনো ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না । কেবল ওখানে গিয়ে অনুভব এই করতে হবে । আর তার জন্য আপনাদের কেও আহ্বান জানাচ্ছি ঘুরে আসার জন্য সীতাকুণ্ড ইকো পার্কের ভিতর অবস্থিত এই সুপ্তধরা ঝর্ণা থেকে । তবে বলা রাখা ভালো এই সুন্দরী কে দেখতে চাইলে আপনাদের অবশ্যই বর্ষা কালেই যেতে হবে। শীত কালে ম্যডাম ঘুমায়। তার জন্যই ম্যডামের নাম সুপ্তধরা ।

যেভাবে যাবেন সুপ্তধরা  ঝর্ণাতে- 

ঢাকা সায়েদাবাদ থেকে চিটাগং গামী যে কোন বাসে উঠে সীতাকুণ্ড নামলেই হবে। এছাড়া ঢাকা কমলাপুর ট্রেন ষ্টেশন থেকেও সীতাকুন্ডের ট্রেইন রয়েছে। সীতাকুণ্ড বাজারে নেমে সিএনজি নিয়ে সোজা ইকোপার্ক বললেই নামিয়ে দিবে। ইকোপার্ক এর ভিতরেই রয়েছে সুপ্তধরা ঝর্না টি

বিশেষ বিশেষ সতর্কতা:
১. আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করবেন না দয়া করে সৌন্দর্য দেখার অধিকার আমাদের আছে, নষ্ট করার অধিকার আমাদের কেউ দেয়নি আমাদের ফেলে আসা চিপস বা চানাচুরের প্যাকেট বা পলিথিন যথাস্থানে ফেলার কাজটি আমাদেরকেই করতে হবে।
২. হাঁটা শুরু করার আগে অবশ্যই আপনার সাথে করে আনা ভালো গ্রিপের জুতো বা হাইকিং স্যান্ডেল পড়ে নিবেন।
( যারা শীত কালে যাবেন তার আমার এই লিখার সাথে অনেকাংশেই অমিল পাবেন কারণ শীতকালে এতো পানি থাকে না আর ঝিরপথ পানি শুন্য থাকে অনেকটা আসল ঝর্ণার রুপ দেখতে হলে আপনাকে অবশ্যই একটু খানি রিস্ক নিয়ে বর্ষাকালেই যেতে হবে । )
(ধন্যবাদ)