Wednesday 22 November

স্বপ্নের মত সুন্দর নাপিত্যাছড়া ট্রেইল

এই ইটপাথরের দেয়ালের ভেতর বন্ধী জীবনে বেশ কিছুদিন ধরেই খাঁচায় আটকে পড়া পাখির মতো হাসফাস করছিলাম ভার্সিটি, পড়াশুনা, ক্লাস, অফিস, আর নিত্যনতুন জীবনের প্যারা থেকে মুক্তি পেতে মন খালি আকুপাকু করছিলো সেই অনুযায়ী কতো প্ল্যান করি !! দেখা যায় শেষ পর্যন্ত কোন না কোন বিপত্তি এসে ট্যুর টাকে মাটি করবেই তাই এবার  ভাবলাম ধুত্তর ছাই , এই প্ল্যান প্লুন বাদ হুট করেই রওনা হবো একদিন

অনেক গুলো জায়গা সিলেক্ট করলাম ফ্রেন্ড মিলে । অবশেষে অনেক রিসার্চের পর বের করলাম যে যদি এক ঢিলে কেবল ২ পাখি না সব পাখিই মারা যায় ক্ষতি কি ! যেই ভাবা সেই কাজ । এবার নেমে পড়লাম এমন এক জায়গা খুঁজে বের করতে যেখানে একি সাথে পাহাড়, সমুদ্র , ঝর্না , নিরিবিলি পরিবেশ , সবুজের সমারোহ সব পেয়ে যাবো ! প্রথমে ভাবলাম সুনামগঞ্জ টাঙ্গুয়ার হাওড় যাবো , পরে আবার ভাবলাম সাজেক ভ্যালি যাবো ! কিন্তু কেনো জানি মন খুত খুত করছিলো!! আর যেহেতু ট্যুর স্পট ঠিক করার দায়িত্ব অনেকটা আমার উপরেই ছিলো তাই বাড়তি চাপে ছিলাম । চেয়েছিলাম এমন কিছু জায়গায় যাবো যেখানে যেয়ে নিজেও চমকিত হবো সাথে ফ্রেন্ড দের কেও একটু ভেলকি দেখালাম । হিরো আলম যদি হিরো বনে যেতে পারে তবে কেনো আমি নয় !! হাহাহাহা ।

যাই হোক , খুজতে খুজতে মন মতো জায়গা পেয়ে গেলাম । সীতাকুন্ডু আর মিরসরাই । প্রশ্ন করতে পারেন কেন সীতাকুণ্ড আর মিরসরাই ? বলছি ভাই - সীতাকুণ্ড আর মিরসরাই হচ্ছে ঢাকা - চট্রগ্রাম হাইওয়ের মাঝখানে । যাতায়াত ব্যবস্থা খুবি ভালো । আগে চট্রগ্রাম যাওয়ার সময় বাসের জানালা থেকে সীতাকুণ্ডের পাহাড় গুলো এমনিতেই আমাকে মন্ত্র মুগ্ধের মতো টানতো । আর আমারো মনে হয় ভ্রমণ পিপাসু যে কাউকেই হাতচানি দিয়ে ডাকবে আকাশের সাথে মিলিয়ে যাওয়া পাহাড় গুলো ! আর যারা ঝর্না প্রেমিক তারা খুব সহজেই সীতাকুণ্ড আর মিরসরাই রেঞ্জের মাঝে অসংখ্য মায়াবী ঝর্না খুঁজে পাবেন । সাথে থাকছে নিরিবিলি কিছু সমুদ্র সৈকত , মোহনীয় মহামায়া লেক , বিশাল ইকো পার্ক । একেবারে একি সাথে ভ্রমণ ও এডভেঞ্চার এর জন্য পারফেক্ট ।

এবার লিখেছি কেবল আমাদের যাত্রার প্রথম স্পট নাপিত্ত্যাছড়া ট্রেইল নিয়ে -

আর এবারের যাত্রায় আমার সাথে থাকছে রানা , উচ্ছ্বাস আর সায়েম ভাই । যাত্রা তারিখ হুট করেই ঠিক হলো , বৃহস্পতি বার ২০ই জুলাই ২০১৭ । এবার পড়লাম বিপাকে কিভাবে যাবো সীতাকুণ্ড । প্ল্যান অনুযায়ী আমাদের প্রথম যাওয়ার কথা নাপিত্তাছড়া ট্রেইল এ সীতাকুণ্ড । অবশেষে ঠিক করলাম ফেনী হয়ে যাবো , কিন্তু বাসে নাকি ট্রেইন এ ! এ আরেক যন্ত্রণায় পড়লাম । সবাই মিলে অবশেষে বাসে যাওয়াই সিধান্ত হলো । সায়েদাবাদ থেকে রাত ১২ টার স্টার লাইন বাসের টিকেট কাটলাম । ঠিক টাইম মতোই বাস ছাড়লো । রাত ৩ঃ৩০ এর দিকে ঘুম ঘুম চোখে ফেনী স্টার লাইন বাস কাউন্টারে নামলাম । নেমে তো তাজ্জব ! দলে দলে ছেলে মেয়ে বাস কাউন্টারে । দেখেই বুঝলাম সবি আমাদের মতো ঘুরা পাগল । তাজ্জব আরেক কারনেও বনেছিলাম । হুম বলছি বৃষ্টি আপুর কথা । বৃষ্টি আপুর মে বি সামনে সেমিস্টার ফাইনাল ছিলো । সে কি পড়া ওনার ! পড়ছে তো পড়ছেই । পড়া আর শেষ হয় না । আমাদের প্ল্যান ছিলো সকাল ৬ টার মাঝে ফেনী মহীপাল থেকে নাপিত্তাছড়া ট্রেইল এর দিকে রওনা দেওয়ার । কিন্তু বৃষ্টি আপুর তো পড়াই শেষ হয় না । অগ্যতা কি আর করা , ম্যডাম এর পড়া কে মাথায় নিয়েই ভিজে ভিজে পৌছালাম মহীপাল । মহীপাল এ লোকাল হোটেল এ নাস্তা সারলাম । বলে রাখি যারা মহিপাল হয়ে নাপিত্যছড়া যাবেন তারা অবশ্যই মহীপাল এ চা খাবেন । আহা কি স্বাদ , সেই বিস্কেট মিশানো চা এর । চায়ের স্বাদ কে মুখে নিয়েই ঝুম বৃষ্টির মাঝে আরো কয়েকটি দল সহ একটা বাস ঠিক করা হলো নাপিত্তাছড়া ট্রেইল এ যাওয়ার জন্য । আর তার জন্য মূলত আমাদের নামতে হবে নরপদুয়ারি নামক জায়গায় । যেটি মিরসরাই বাজারের পর পড়ে চীটাগং যেতে পড়ে । বাস ড্রাইভার ভুল করে আমাদের আর সামনে নিয়ে গেলো , আগে থেক কিছু খোজ খবর নিয়ে যাওয়ার কারণে পরে চিনতে পারছিলাম নরদুয়ারী থেকে নাপিত্তাছড়া ট্রেইল এ যাওয়ার সেই রোড । বাস থেকে নেমে দেখি প্রায় ৫০ জনের মতো জড় হয়েছি আমরা । তখন প্রায় ৭ টা বাজে । হাল্কা কিছু নাস্তা খেলাম ওখানে তারপর হাতা শুরু করলাম পলিথিন মাথায় দিয়ে । পলিথিন কেন মাথায় ! বুঝলেন না ব্যপারটা এখনো !? - আরে বৃষ্টি আপু যখন পড়া শুরু করেছে তখন এতো তাড়াতাড়ি কি আর তার পড়া শেষ হয় !

 

গ্রাম পেরিয়ে আমরা হেটে চলতে চলতে পাহাড়ের দেখা পেলাম । তার আগে রেল লাইনের দেখা পেয়েছিলাম । সেখান থেকে সবার দেখাদেখি আমরা ৪ জন ৪ খানা লাঠি নিলাম ট্রেওলিং এর জন্য । আর এই লাঠির গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলাম আরো ৬ ঘন্টা পর ! সে কাহিনি পরে বলছি । রাস্তা পুরা কাদা । আর সে কি বৃষ্টি !!! প্রথম দুঃসংবাদ টা পেলাম এখানেই কয়েকটি স্থানীয় ছেলের কাছে , অতি বৃষ্টি তে নাকি পাহাড়ি পানির ঢলে স্রোত খুবি ভয়ানাক হয়ে আছে অনেকেই নাকি সকাল হতে যেয়ে ফিরে এসেছে ! কয়েকজন গাইড এসে বললো ওদের কে সাথে নিতে ! কিন্তু গাইড নেওয়ার ইচ্ছে ছিলো না । ভাবছিলাম নিজেরাই সব কিছু আবিষ্কার করবো ! দুঃসংবাদ শুনে একটু থমকে গেলেও তখন এডভেঞ্চার এর নেশা আমাদের মাথায় পুরো দমে ছেপেছে । এগুতে থাকলাম আল্লাহর নাম নিয়ে । পথিমধ্যে শুনলাম আরো কিছু দুঃসংবাদ । পাহাড় ধস এর খবর । থোড়াই কেয়ার করি পাহাড় ধসের । এগুতে থাকলাম । কিন্তু ট্রেইল এর মুখে এসে বিশাল এক দল দেখলাম । আমরা সহ প্রায় ১০০ জনের দল । সবাই হাবলার মতো তাকিয়ে আছে ট্রেইল এর দিকে !! এ কি দেখছি !! কই ভাবলাম পাথুরে আর হাল্কা পানির ট্রেইল এর মাঝ দিয়ে গুন গুন করতে হেটে ঝর্না দেখে আসবো । আর নিজ চক্ষুদয় দিয়া এ কি দেখছি আমরা !! ট্রিল এর শুরুর দিক টাই এই হয়ে আছে নদীর মতো তাও আবার স্রোত । স্রোতের গর্জন পাড় থেকেই বেশ পাচ্ছি । প্রথমে তো ভাবলাম এটাই বুঝি ঝর্নার পানির শব্দ । কিন্তু সাহস সঞ্চয় হল এতো বিশাল এক টিম দেখে । আর সবাইকেই বেশ হেল্প ফুল দেখলাম ।

 

শুরু হলো মোটামুটি জীবন-মরণ খেলা । আল্লাহর নাম নিয়ে অজান এই পথে পা বাড়ালাম । মাথার উপর বৃষ্টির ছাট , পায়ের নিজে এবড়ো থেবড় পাথর আর স্রোতের খেলা একটু পর পরেই বুকে কাপুনি ধরিয়ে দিচ্ছিলো ! ট্রেইলের শুরুর দিকেই দলের কাহিল অবস্থা । স্রোতের মাঝ খান দিয়ে ট্রেইল এ বার বার এপাশ থেকে অপাশে যাওয়া যত ঝামেলা করছিলো । এই সব দোষ বৃষ্টি আপুর । পাহাড়ে রাস্তা সব পিচ্ছিল , হেটে যাওয়ার অবস্থা নেই । আল্লাহর নাম নিয়ে লাঠি দিয়ে ভর দিয়ে দিয়ে একের পিছনে এক ট্রিইলিং করে যাচ্ছি । ১০-১৫ মিনিট ট্রেইলিং করার পর দলের অনেকেই হতাশ হয়ে গেলো । আর কয়েকজন কে পেলাম আমাদের মতোই । যে না যাই হোক না কেন, নাপিত্তাছড়া ট্রেইল শেষ করেই ছাড়বে । পানির গর্জন, ঝোঁক মামার রক্ত খাওয়ার ভয়, পানির নিছে পিছলা খাওয়ায় আর উস্টা সে তো নিয়মিতোই খাচ্ছিলাম । কিন্তু তখন আমি আর আমার মাঝে নাই । মনে হচ্ছিলো আমি জন্মেছিই এ পথে হাটার জন্য । আসলে তখন নিজেকে মনে মনে এগুলো বলেই মোটিভ করছিলাম ।

 

বিগত ৫ দিনের বৃষ্টির পানি জমে পাহাড় থেকে নামছে । এমনটাই হবে স্বাভাবিক। কিন্তু ভয় কাটিয়ে আস্তে আস্তে অদ্ভুত এক ভালো লাগা শুরু হতে থাকলো । ট্রেইলের ভিতরে ঢুকছি আর নীরবতা বাড়ছে , এখন কেবলি পানির শব্দ । আর আমাদের পায়ের ছপ ছপ শব্দ । একটা পাথুরে ক্যসকেড পার হই তো আরেকটা সামনে এসে পড়ে । আর এক সময় সব কিছুকেই চ্যালেঞ্জ মনে হচ্ছিলো । তখনি উপলদ্ধি করতে পারলাম আসলে জীবনে চ্যলেঞ্জ এর কত টা প্রয়োজন । চ্যালেঞ্জ আপনাকে বাঁচতে শিখাবে । আর এই ট্যুর থেকে এটাই আমার শিক্ষা ।

 

ট্রেইলের মাঝে মাঝে কিছু কিছু যায়গায় পাহাড়ের উপর থেকে পানি চুয়ে চুয়ে পড়ছে আর ছোট ছোট ঝর্না তৈরি করেছে ! মানে এ দৃশ্য গুলি আপনি একবার দেখলে আর কখনোই ভুলবেন না । এভাবেই ভয় কে জয় করে মোটামুটি ১ ঘন্টার ট্রেইল করে পিছনে ফিরে দেখলাম ১০০ জন থেকে এখন মাত্র জনা ২০-২৫ জন আছি আমরা । বাকিদের আর দেখা যাচ্ছে না । ট্রেইল শেষ করে বুঝেছিলাম ঝুকি টা নেহাত কম ও ছিলো না আমাদের জন্য। যেহেতু কারোই পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই এরকম ট্রেইলিং করার। কি আর করা। এই ২০-২৫ জনই চলতে থাকলাম। লাঠি দিয়ে পানিতে ভর দিয়ে পাথুরের নাগাল পেলে এক কদম ফেলি তারপর আরেক কদম । এভাবেই এগোচ্ছিলাম । হটাত সামনের একজনের চিৎকার শুনতে পেলাম ভাবলাম বিপদ ঘটলো নাকি ! কিন্তু এগিয়ে দেখি একটু সামনেই আমাদের কাঙ্ক্ষিত নাপিত্যছাড়া ট্রেইল এর প্রথম ঝর্ণা ! যেটিকে নরদুয়ারী ঝর্ণা বলে । ২টি ধাপ এটির । বর্ষাকাল না হলে ১ম ধাপ বেয়েই উপরে উঠা যায় কিন্তু এখন তো যৌবন ঝর্ণার । তাই আরো কস্ট করে আরেকটা পাহাড় টপকিয়ে আমাদের উজিল্লা ঝর্ণার উপর উঠতে হলো। এখানে এসে সত্যিই ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম নিচে তাকিয়ে । কেবল ভাবছিলাম যদি একবার স্লিপ খাই এই যায়গায় শরীরের হাড্ডী কি একটাও অবশিষ্ট থাকবে আমার ! পা টিপে টিপে ঝর্ণার এক পাশ থেক আরেক পাশে গেলাম। এতো কাছ থেকে জীবনে প্রথম ঝর্না দেখা তাও আবার বিপুল পরিমান পানি সহ। বাক হারা হয়ে গেলাম। ঝর্না মুখের তাকিয়ে সম্মোহিত হয়ে গেলাম অনেকটা। খানিকটা পর হুশ আসলো , নাহ এবার কিছু ছবি তুলি। রানা উচ্ছ্বাস আর সায়েম ভাই কে ডেকে কিছু ছবি তুল্লাম। তার পর যে যার মতো লম্প ঝম্প । এতো কস্টের পর মনে হয় যেন আমরা পেলাম। পেলাম আমাদের মায়াবতী কে। মূল ঝর্ণার ফোয়ারার পাশেই আরেকটি চিকন পানির ফোয়ারা পেলাম। একেবারে স্বচ্ছ পানি। একটু খানি পান করলাম আল্লাহ প্রদত্ত এই সুমিষ্ট পানি। প্রায় ৪৫ মিনিট কাটালাম উজিল্লা ঝর্ণায়। তখন প্রায় ৯ঃ৩০ বাজে ।

 

এবার বুঝে উঠতে পারছিলাম না আসলে পরবর্তী ঝর্ণা গুলোতে কিভাবে যাবো । একজন গাইড ছিলো আরেকটি দল ওনাকে এনেছিলো । ওনাকে দেখলাম ঝর্নার পানির ২ ফোয়ারার মাঝে উচু একটা জায়গা দিয়ে উপরে উঠে যেতে। পিছু নিলাম ওনার । এর মাঝে আবার কোন এক ভদ্রলোক আমার লাঠিখানা নিজের মনে করে নিয়ে গিয়েছেন। পড়লাম বিপাকে। কারণ এখানে লাঠি ছাড়া চলা এক কথায় অসম্ভব। যাই হোক, উচ্চাসের লাঠি আমি নিলাম , উচ্ছ্বাস কে দেখলাম এমনিতেই তরতরিয়ে উঠে যেতে পাহাড়ি পিচ্ছিল রাস্তা ধরে । আর রানা রীতিমতো ধাওয়া শুরু করেছে আগের দলকে আমাদের লাঠি ফিরত নিতে । যাক অবশেষে তার ফাপড় কাজে লাগলো, ফিরে পেলাম এক মাত্র ভরসা লাঠিকে। এবার চলা শুরু পিচ্ছিল পাহাড়ি রাস্তা ধরে। কোথাও উচু, কোথাও নিচু। দলের সবাই একে অপরকে মোটামুটি সাহায্য করে এগোচ্ছে । তাই বেশী অসুবিধা হচ্ছিলো না । তখন বৃষ্টি আপুর সিলেবাস ও মে বি শেষ হয়েছে কারণ তার পড়া কমেছে তখন।

 

খানিকটা পাহাড় ট্রেকিং করার পর আবার সেই ঝিরিপথ ধরে ট্রেইল শুরু। এদিকটায় স্রোত আরো বেশী । ধুত্তর ভয় টয়, তখন কেবল মাথায় নেশা আর নেশা । ঝর্নার মায়ার নেশা । কোথাও গভীর, কোথাও অগভীর ঝিরিপথ ধরে এবার দ-মুখি এক জিরিপথের সামনে এসে পড়লাম। দু দিকে দুটি টানেল চলে গিয়েছে। জানতাম যে, দু দিকে গেকেই দুটি ঝর্না পাবো। আমরা কয়েকজন বামের টি ধরে আগালাম । আর কয়েকজন ডানের টা । ১০-১২ জনের দল হলাম এবার। ব্যপার না । আমরা এই ১০-১২ জনই মোটামুটি এনারজিটিক ছিলাম ততক্ষন পর্যন্ত । গুনাক্ষরেও টের করতে পারি নি কি ভয়ানক এক রূপসী বসে আছে তার মায়ার জাদু দেখাতে আমাদের জন্য !

 

আরো প্রায় ২৫-৩০ মিনিট ট্রেইলিং করআর পর শুনতে পেলাম পানি আছড়ে পড়ার শব্দ । মনে হচ্ছিলো আল্লাহ আসমান থেকে সব পানি একত্রে মনে হয় এই যায়গায় ফেলছেন। ১০ কদম এগিয়ে যা দেখলাম তা আমি কোন ভাবেই লিখে এখানে বুঝাতে পারব না আপনাদের । বলছি , বাঘবিয়ানি ঝর্নার ভয়ংকর সৌন্দর্যের কথা । এমনিতেই বাঘবিয়ানীর চারপাশ টা কেমন জানি ভুতুড়ে টাইপের। বিশাল নিরেট পাথুরে দেয়াল উঠে গিয়েছে উপরে। চারপাশ টা পুরোপুরি বদ্ধ। তার মাঝ খানে পাহাড় চুয়ে পড়ছে বিশাল জলরাশির ফোয়ারা। সমুদ্রের গর্জন থেকে কোন অংশেই কম নয় এ রুপসীর গর্জন। প্রথমে ভয়ে পানির নিচে যাই নি । উচ্ছ্বাস তো দেখেই বেশ লম্প ঝম্প করছে আর সেই এক্সাইটেড। রানা খালি চিল্লাচ্ছে। সায়েম ভাই চশমা মুচতেছে । পানির ঝাপ্টায় সব ঘোলা। কি ছবি তুলব আর । ক্যমেরা ওপেন করলেই পানির ঝাপ্টায় ঘোলা হয়ে যায় । অগ্যতা ছবি তুলা বাদ দিয়ে শরীর ভিজায় মন দিলাম। মনে হচ্ছিলো পানির ভেতর কোন বিশাল দৈত্য পানি দিয়ে আমার পিঠে বাড়ি মারছে ! বেশিক্ষন থাকার সাহস পেলাম না ঝর্ণার পানির নিচে। শরীর জমে বরফ । তবে এর মাঝে আবার আকাশে সূর্যি মামা ও হালকা ভেংচি কাটছে আমাদের আনন্দ দেখে । ২০ মিনিটের মত থাকলাম বাঘবিয়ানীর কোলে । তারপর আবার ব্যাকপ্যাক নিয়ে ফিরতে পথে ।

 

ট্রেইল করতে করতে সেই আবার দু মুখী ঝিরিপথ এর সামনে আসলাম । এবার এগুতে থাকলাম ডান পাশে পথ ধরে । আর এ ট্রেইল টি অন্যন্য ট্রেইল থেকে বেশী সুন্দর ছিলো । একদম টানেলের মত । মাথার উপরে সবুজের ছায়া , পায়ের নিচে বরফ জমা ঝর্ণার পানি আর সামনে নতুন কিছু দেখার নেশা। পুরাই ঘোরে ছিলাম । কথা দিচ্ছি আপনিও কোন এক ঘোরের দেশে চলে যাবেন। মাঝে উচু একটা ক্যসকেড পাড়ি দিয়েই পড়লাম আরেক সুন্দরীর মুখে। আর সৌন্দর্যের দিক থেকে এবারের বান্দরখুম ঝর্ণা সবাইকে পিছনে ফেলেছে। উপর থেকে বিশাল জল রাশি আছড়ে পড়ছে বিশাল এক ছড়ানো পাথরের উপর। আর সেই পানি ছড়িয়ে পড়ছে নিচে । পুরাই লা - জওয়াব দৃশ্য । মনে হচ্ছিলো বাহিরের কোন দেশে এসেছি ঝর্ণা দেখতে । আমাদের দেশে হাতের কাছেই যে প্রকৃতির এতো সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে বাসা থেকে বের না হলে তো কখনো তা আবিষ্কার এই অরতে পারতাম না । তাই বলছি, প্লিজ আপনিও বের হউন ঘর থেকে। আবিষ্কার করুন অন্য এক মায়ার জগতে নিজেকে। যেখানের বাতাসে কোন ভেজাল নেই। হারাতেই হবে আপনাকে অপার এই সৌন্দর্যের মাঝে ।

 

বান্দরখুম এর স্পটে অনেক মানুশ দেখলাম । অনেক আপু দের ও দেখলাম ভয় মাখা মুখ নিয়ে ঝর্ণা দেখছে আর হাসছে । মনে মনে বাহবা দিলাম এই সাহসী আপু দের । ঝট পট কিছু ছবি তুলে ক্যমেরা ট্যমেরা রেখে রানা , উচ্ছ্বাস , সায়েম ভাই সহ দে দৌড় পানির ফোয়ারার নিচে । মাথা টা যখন রাখলাম পানির নিচে । অদ্ভুত এক শান্তি উপলদ্ধি করলাম । কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে ছিলাম , এক সাথে সব প্রিয় মুখ মনে পড়লো । আব্বু, আম্মু , আরমান, আফরিন, সালমা , স্কুলের বন্ধু দের নিজের কিছু অতীত । মাথা টা পানি ত্থেকে সরানোর পর অদ্ভুত এক পবিত্রতা আর একদম হালকা লাগছিলো নিজেকে ।

আপনারো ভীষণ দরকার এই অনুভুতি গুলোর তাই বলছি কি  ভাইয়া - আপুরাজীবনের মানে কিছু টা হলেও খুঁজে পেতে সময় করে বেরিয়ে পড়ুন এমন কিছু জায়গায় যেখানে আপনি নিজেকে অন্য ভাবে আবিষ্কার করবেন আর সীতাকুন্ডুর এই নাপিত্যাছড়া ট্রেইল কোন অংশেই  আপনাকে হতাশ করবে না ঠিকি জায়গা করে দিবে তার বিশাল সৌন্দর্যের মাঝে আপনাকে

বান্দরখুম এর সামনে বেশ পানি জমে গিয়েছিলো । গভিরতাও ছিলো অনেক । তাই মোটামুটি ভালোই সাঁতার কাটলাম কিছুক্ষন । ততক্ষণে ঝর্ণার বরফ পানি আর বৃষ্টির পানিতে ভিজে শরীর পুর হিমসাগর হয়ে আছে। তাই আর বেশী দেরী করলাম। আস্তে আস্তে ফিরার পথ ধরলাম। তখন ট্রেইল এ পানি না কমলেও স্রোত কিছু টা কমে গিয়েছিলো। কিন্তু গাইড মামা আমাদের পাহাড়ি পথ ধরে নিয়ে চললো। বেশ খাড়া একটা পাহাড়ের উপর উঠলাম। এবার ঢালু পিচ্ছিল পথ ধরে নামতে থাকলাম। মাঝে মাঝেই পা পিছলে জাচ্ছিলো। বেচে গিয়েছিলাম জুতার নিচে খাজ ছিলো। প্লেইন জুতো হলে গিয়েছিলাম ঐদিন একেবারে ৫০০ ফুট নিচে। প্রায় ২ ঘণ্টা পাহাড় ট্রেকিং শেষে আবার আমরা ট্রেইল এর মুখে এসে থামলাম। পা এর অবস্থা তখন কাহিল। কারো পায়ে জোক মামা বেশ আদর করেছে। রানা কে তো ৩ টা ধরছিলো। কিছুক্ষন তাকিয়ে ছিলাম ট্রেইল টার দিকে। আর মনে মনে ভাবছিলাম , কি ভয়ানক সৌন্দর্য টাই না দেখালে তুমি আমাদের নাপিত্ত্যাছড়া ! আধিবাসী দের কিছু বাড়ি পের‍্যে এগুতে থাকলাম রাস্তার দিকে। পিছনে রেখে আসলাম সপ্নের মতো এই নাপিত্ত্যাছড়া ট্রেইল। 

চোখ ব্যথা হয়ে গিয়েছে মেবি এতক্ষণ আমার বক বক পড়তে পড়তে ! না ?

 *এবার আপনাদের প্রয়োজনীয় কিছু দিক নির্দেশনা বলছিঃ


যেভাবে যাবেন নাপিত্ত্যাছড়া ট্রেইল -

 ১ = ঢাকা সায়েদাবাদ টু ফেনি মহিপাল - ২৫০ টাকা/২৭০ টাকা, নন এসি । এসি - ৩৫০ টাকা (স্টার লাইন, এনা পরিবহন, কে.কে ট্রাভেলস, সেবা পরিবহন) । ফেনী বাস স্ট্যান্ড থেকে মহিপাল চলে যাবেন । মহীপাল থেকে নয়দুয়ারি মসজিদ - ৩৫ টাকা (লোকাল বাস)।

২ = ঢাকা থেকে চিটাগংগামী যে কোন বাসে উঠে বাসের সুপারভাইজার কে বলে রাখবেন নরদুয়ারি মসজিদ এর সামনে নামিয়ে দিতে । এক্ষেত্রে গুগল ম্যাপ ব্যবহার করলে ভালো হবে ।

১. আপনারা চাইলে ট্রেইন এ যেতে পারেন।  চিটাগাং মেইল ট্রেন কমলাপুর থেকে ১০ঃ৩০ এ ছেড়ে যায়। তাই চেষ্টা করবেন আগে যেতে। কারণ এটা লোকাল ট্রেন সিট নাও পেতে পারেন। ভাড়া ৯০ টাকা।

২. ফেনী পোঁছে যাবেন সকাল ৬ টার আগেই। ইচ্ছে করলে ষ্টেশনে অপেক্ষা করতে পারেন কারণ ৬ঃ৪০ এর দিকে ডেমো ট্রেন আছে ওইটা দিয়ে মিররসরাই যেতে পারবেন (ভাড়া ২০টাকা)। ডেমো ট্রেন দিয়ে গেলে মিররসরাই নেমে লেগুনা দিয়ে নয়দুয়ারি বাজারে চলে যাবেন (ভাড়া ৫টাকা)।

অথবা,

স্টেশন থেকে টমটমে মহিপাল (ভাড়া ১০টাকা) এবং সেখান থেকে চিটাগাং গামী যেকোন বাসে উঠে যাবেন। অবশ্যই দামাদামি করে নিবেন। লোকাল বাস গুলা ৫০ টাকা নিবে এবং ভালোগুলা ১০০ নিতে পারে। বাসের কন্টাকডারকে বলবেন নয়দুয়ারি বাজারে নামিয়ে দিতে। যদি কোন ভাবে কন্টাকডার নয়দুয়ারি না চিনে তাহলে আপনার মোবাইলের জিপিএস ব্যাবহার করে সহজেই নয়দুয়ারি বাজার নেমে যেতে পারবেন।

৩. নয়দুয়ারি বাজার থেকে দেখবেন পাহাড়ের দিকে একটা রাস্তা চলে গেছে। ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটা শুরু করবেন।

৪. কিছুক্ষন হাঁটলে রেললাইন পেয়ে যাবেন। ওইট ক্রস করে একটু হাঁটলে ঝিরি পথ পাবেন। তারপর ঝিরি দিয়ে হাঁটা শুরু করুন। ২০ মিনিট হাঁটলে একটা ক্যাসকেড পাবেন ।

৫. প্রথম ক্যাসকেডের উপর উঠার পর দেখবেন হাতের ডান পাশে পাহাড়ে উঠার একটা রাস্তা রয়েছে। ওই রাস্তা দিয়ে উপরে উঠার পর দেখবেন আবার ঝিরিপথ।

৬. ঝিরিপথ দিয়ে সামনের দিকে গেলে দেখবেন ঝিরিপথ দুইটা ভাগ হয়ে গেছে। হাতের বাম পাশে গেলে বাঘবিয়ানি ঝরনা পাবেন এবং ডানে গেলে বান্দরখুম/মিঠাইছড়ি ঝরনা পাবেন।এ দুটির যে কোন একটি ধরে গেলেই হবে। তবে এছাড়া ওন্য রাস্তা ধরে এগুবেন না ।

 

বিশেষ বিশেষ সতর্কতা:


১. আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট করবেন না দয়া করে। সৌন্দর্য দেখার অধিকার আমাদের আছে, নষ্ট করার অধিকার আমাদের কেউ দেয়নি। আমাদের ফেলে আসা চিপস বা চানাচুরের প্যাকেট বা পলিথিন যথাস্থানে ফেলার কাজটি আমাদেরকেই করতে হবে।

২. হাঁটা শুরু করার আগে অবশ্যই আপনার সাথে করে আনা ভালো গ্রিপের জুতো বা হাইকিং স্যান্ডেল পড়ে নিবেন।

৩. চাইলে গাইড নিতে পারেন।আমার মতে একেবারে এসব জায়গায় ঘুরাঘুরির অভ্যাস না থাকলে গাইড নেওয়াই উত্তম। তবে দরদাম করে নিবেন । ২০০ টাকা-৩০০ টাকা নিতে পারে।

৪. ফোনে নেটওয়ার্ক ভালো পাওয়া যায় না তাই আগেই কারো সাথে প্রয়োজনীয় কথা বার্তা থাকলে সেরে নিবেন বিশেষ করে পরিবারের মেম্বার দের সাথে।

৫. বৃষ্টির মধ্যে ডিএসএলআর ক্যামেরা নেয়া থেকে বিরত থাকবেন। বলা যায় না । শখের ক্যমেরা টা হারাতেও পারেন । এবং সাথে অবশ্যই পলিথিন রাখবেন মোবাইল বাঁচানোর জন্য।

( যারা শীত কালে যাবেন তার আমার এই লিখার সাথে অনেকাংশেই অমিল পাবেন । কারণ শীতকালে এতো পানি থাকে না । আর ঝিরপথ ও পানি শুন্য থাকে অনেকটা । আসল ঝর্ণার রুপ দেখতে হলে আপনাকে অবশ্যই একটু খানি রিস্ক নিয়ে বর্ষাকালেই যেতে হবে । )

আশা করি নাপিত্ত্যাছড়া ট্রেইল এর মতো কস্টসাধ্য লেখাটি পড়ে ভালো লেগেছে আপনাদের আপনারাও ঘুরে আসুন এই ভিন্ন জগত থেকে জয় হোক ট্রাভেলিং এর