Thursday 3 September

"জন্মই যার ফুটবলের বিশ্ব সেরা হওয়ার জন্য"- লিওনেল মেসির আত্নজীবনী

আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরকে বলা হয় বিপ্লবীদের আতুড় ঘর। চে গুয়েভরার মতো বিপ্লবী নেতার জন্ম হয়েছিলো এ শহরেই। তার ঐতিহ্য ধরে রেখেই ১৯৮৭ সালের ২৪ই জুন আরেক ফুটবল বিপ্লবীর জন্ম হয়েছিল এ শুহরে। দরিদ্র এক পরিবারে জন্ম ছেলেটির। বাবা সামান্য বেতনে স্টিল কোম্পানিতে কাজ করতেন, আর মা একটি চুম্বক কারখানায়। ছেলেটি ছোট বেলা থেকেই চুপচাপ স্বভাবের হলেও ফুটবল কাছে পেলেই হয়ে যেতেন দুরন্ত। বাবা মায়ের বারণ সত্তেও সুযোগ পেলে তাই দাদীর সহযোগিতায় বেরিয়ে পড়তেন ফুটবল নিয়ে।

ছেলেটির বয়স তখন সবে পাঁচ। এর মাঝেই তার সব সখ্যতা গড়ে উঠেছে ফুটবলের সাথে। দিন, রাত, দুপুর সারাক্ষন তার মনে কেবল ফুটবল নিয়েই জল্পনা-কল্পনা । ছেলের ফুটবল মেধা দেখে বাবা তার স্থানীয় দল গ্রান্দেলি তে ছেলেকে নিয়ে নিলেন। পুচকে শিশুটি বল নিয়ে মাঠে একের পর এক বড় বড় প্লেয়ার দের নাকানি চুবানি খাইয়ে তীরের মতো ছুটে চলতো গোল মুখে! করতে লাগলো একের পর এক গোল,  আশেপাশের মানুষ কেবল তখন বিস্ময় নিয়ে ছেলেটির খেলা উপভোগ করতো। ১৯৯৫ সালে তার ফুটবল প্রতিভার জোরে যোগ দিলো নিউ ওল্ড বয়েজ ক্লাবে। তারপর থেকেই হয়ে গেলো ক্লাবের  এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তার ফুটবল জাদুর উপর ভর করে ক্লাবটি ৪ বছরে মাত্র ১ টি ম্যাচ হেরেছিলো! ততদিনে ছেলেটির নামের পাশে যোগ হয়েছে ৫০০ গোল এবং জুড়ে গিয়েছে! “দ্যা মেশিন অব ৮৭” এর তকমা।

বয়স পেরিয়ে ১০ হলো কিন্তু উন্নতি হচ্ছলি না তার শারীরিক অবস্থার!  চিন্তিত বাবা মা ডাক্তার দেখিয়ে জানতে পারলেন তাদের ছোট্ট ছেলেটি দুরারোগ্য হরমোন সমস্যায় ভুগছে যার জন্য সে দৈহিক ভাবে বাড়ছে না এমনকি হয়ে যেতে পারে পংগু ও। আর এর চিকিৎসা বেশ ব্যায়বহুল, দিনে প্রায় ৯০০ ডলার! অভাবের সংসারে কোথা থেকে আসবে এতো টাকা! তখন সবার মনে ছিলো একটাই প্রশ্ন, তবে কি বিশ্ব হারিয়ে ফেলবে অপার সম্ভাবনা ময় এক ফুটবল বিস্ময় বালক কে!!

ঠিক সেই সময়েই স্পেনে তার এক আত্নীয়ের পরামর্শে ছেলেটি বিখ্যাত ক্লাব বার্সেলোনায় ট্রায়াল দেয়ার সুযোগ পেলো। ছোট্ট ছেলেটি বাবাকে সাথে নিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে প্রিয় পরিবার আর ভালোবাসার দাদী কে বিদায় দিয়ে স্বপ্ন পূরণে উড়াল দিলো বার্সেলোনায়। মাথায় আজীবনের মতো পংগু হয়ে যাওয়ার ভয় নিয়ে সেদিনের ট্রায়ালে ফুটবল পাগল ছেলেটি ছিল অনবদ্য, সব প্লেয়ারের বাধা পেরিয়ে চুম্বকের মতো বল টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো গোল বারের দিকে। আর কিছুক্ষন পর পর করছিলো গোল উল্লাস। এমন ফুটবল প্রতিভা দেখে তৎকালীন বারসেলোনা টিমের ক্রীড়া পরিচালক কার্লেস রেক্সাস বললেন এই ছেলেকে আমি চাইই চাই। সাথে সাথে হাতের কাছে কাগজ না পেয়ে রেস্টুরেন্টের টিস্যু পেপারেই তার বাবার সাথে চুক্তি করলেন সাথে ছেলেটির চিকিৎসার দায়ভার নিলেন।

১৪ বছর বয়সে রোগ সেরে ছেলেটি বার্সার যুবদলে যোগ দিল। মাত্র ৩০ ম্যাচ খেলেই ৩৭ গোল দিয়ে ফুটবল দুনিয়ায় দিয়ে রাখলেন তার আগমনী বার্তা। অবশেষে ২০০৩ সালের ১৬ই নভেম্বর মাত্র ১৬ বছর বয়সেই বার্সার মূল দলে অবিষেক ঘটলো তার । অভিষেক ম্যাচে ৭৫ মিনিটে মাঠে নেমেই গোল মুখে নিয়েছিলেন ২ টি শট । সেদিনের সেই ২৫ মিনিট খেলা দেখেই দর্শকরা বুঝেছিলো ফুটবল জগত পেতে যাচ্ছে তাদের নতুন রাজা।

২০০৩ থেকে ২০২০ ,সকল বাধা বিপত্তি পেরিয়ে গত ১৭ বছর ধরে সেদিনের সেই পংগু হয়ে যাওয়ার ভয়ে থাকা ছেলেটি আজ ফুটবল জগতের অন্যতম তারকা। যার সামনে মাথা নত করেছে শত শত ফুটবলের রেকর্ড, ঝুলিতে জমা হয়েছে বিশ্বের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে টানা ৪ বার সহ মোট ৬ বার ব্যালন ডি ওর জয়, এবং ৬ বার ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট  অর্জনকারি। অগনিত  একক  পুরস্কারের পাশাপাশি ক্লাব বার্সেলোনায় এনে দিয়েছেন এ পর্যন্ত ৩২ টি মেজর শিরোপা। যার মাঝে মোট ৯টি লা লীগা, ৬টা কোপা ডেল রে, ৮টি সুপার কাপ, ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ তিনটি ক্লাব বিশ্বকাপ উল্লেখযোগ্য।  জাতীয় দলের হয়ে জিতেছেন অলিম্পিক গোল্ড কাপ , যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে নিজের দেশ কে নিয়ে গিয়েছিলেন ২০১৪ এর বিশ্বকাপ ফাইনালে। কিন্তু দুর্ভাগ্য ক্রমে ফুটবল যুবরাজের ছোয়া হয়নি সেই বিশ্বকাপ। কিন্তু ঠিকি তিনি পেয়েছিলেন সবার ভালবাসা আর প্রশংসা।

এতো এতো অর্জনের পেছনে সেদিনের সেই ছেলেটিই আজ ফুটবল বিশ্বের সেরাদের সেরা একজন,  যাকে আমরা সবাই এক নামে লিওনেল মেসি নামে চিনি।  যার নাম ছড়িয়ে গিয়েছে সমুদ্রের মাঝে দ্বিপ দেশ থেকে প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে।, তার নান্দনিক ফুটবল দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তার প্রতি রয়েছে কোটি কোটি ফুটবল দর্শকের অকুন্ঠ সমর্থন।

মেসির খেলা ঐশ্বরিক, জাগতিক সকল সৌন্দর্যকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে আমাদের সবাইকে বিমোহিত করে রেখেছেন মেসি.. তিনি বল নিয়ে দৌড়ালে পায়ে যেন ফুল ফোটে, প্রতিপক্ষের স্বপ্নভঙ্গ হয়..নিজের দল ফিরে পায় জয়ের আত্নবিশবাস,  আমাদের মনের মাঝে তৈরি হয় ফুটবল নিয়ে এক নেশা, এক ভালোবাসা...

সেই ভালোবাসার মাঝেই বুঝি কাটা হয়ে এখন খবর উঠেছে মেসি বার্সা ছাড়তে যাচ্ছেন। বিগত  কয়েক বছরে বার্সা বোর্ড  একের পর এক ভুল সিধান্ত নিয়ে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে মেসি সহ পুরো দলকেই। বার বার বলেও দল ঠিক করার ব্যাপারে বোর্ডের থেকে যখন সাহায্য পাচ্ছেন না তখনি বুঝি অভিমান করেই ফুটবল রাজ ঘোষণা দিলেন, সম্পর্ক ছিন্ন করতে চান প্রাণের ক্লাবের সাথে। সাথে সাথেই সরগোল পরে গেল বিশ্বে। বার্সা সমর্থকরা তাকে  দলে রাখার জন্য আন্দোলন করতে রাস্তায় নেমেছেন কান্নার জোয়ার বইছে ফুটবল জগতে।  এ পর্যন্ত কোন খেলোয়ারের দলবদল নিয়ে এতটা মাতামাতি হয়নি যতটা হচ্ছে মেসিকে নিয়ে। মাত্র ২ দিনেই মেসি কে নিয়ে রেকর্ড পরিমাণ ১০ মিলিয়নের উপর টুইট হয়েছে

কিন্তু দিন শেষে মেসি যেই ক্লাবেই খেলুক না কেনো,  মানুষের ভালোবাসার প্রাপ্তিতে সেটা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। ফুটবল যুবরাজ ও তার পায়ের শৈল্পিক জাদুতে আমাদের আরো কটি বছর আচ্ছন্ন করে রাখবে , এটাই কেবল আমাদের চাওয়া। সে জন্যই বিখ্যাত ফুটবল কোচ পেপ গারডীওয়ালা মেসিকে নিয়ে বলেছিলেন –

তাকে বিচার করতে যাবেন না, মেসিকে কেবল উপভোগ করে যাবেন। জয়তু মেসি...