Friday 1 May

ঝড়ের রাতে মারায়ন তং পাহাড়ের চূড়ায় ক্যাম্পিং ট্যুর

শুনেছি মানুষের জীবনে অনেক টান থাকে, নাড়ীর টান, মায়ার টান আরো কতো টান!! আমি ধরে নিচ্ছি আপনি একজন প্রকৃতি প্রেমিক, তো প্রকৃতির কোন জিনিসটা আপনাকে বেশী টানে? যেই টানে যেকোন সময় যে কোন কিছু ছেড়ে চলে যেতে পারবেন আপনি? একটু ভাবুন আর খুঁজে বের করুন, কিসে আপনাকে প্রকৃতির দিকে বেশী টানে? সেই ফাকে আমি একটু আমার টানের কথা বলছি- 

জীবন জীবনের গতিতেই চলে, সকালে ঘুম থেকে উঠা, সারাদিন চাকুরি, ব্যাবসা কিংবা স্কুল-কলেজ একটু বেশী আহ্লাদী হলে নাহয় প্রিয়জনকে নিয়ে কিছুটা সময় পার করা। এইতো আমাদের জীবনের গতি। এর মাঝেই একদিন হুট করে রক্তে পাহাড়ের টানের বান বয়ে গেলো, স্বাভাবিক জীবনের সবকিছুই তখন কেনো জানি অস্বাভাবিক লাগছিলো। মনে হচ্ছিলো পাহাড়ের মাটিতে পা লাগানো ছাড়া রক্তে এ টান থামবেনা। হিসেব কষে দেখলাম ৮, ৯ ও ১০ নভেম্বর ৩দিন বন্ধও পাচ্ছি। সোনায় সোহাগা একেবারে, স্বপ্নঘুড়ি টীমকে রেডি করে ফেললাম পাহাড়ে যাওয়ার জন্য। তবে মনটা কেনো জানি খচখচ করছিলো ট্যুর প্ল্যান নিয়ে। পরে যখন ভেবে দেখলাম এ টান যখন পাহাড়ের তখন পাহাড়ের বুকে মাথা না রাখলেই নয়, সাথে সাথেই তাবু কিনা, ব্যাক প্যাকিং ট্যুর এর টুকটাক জিনিস কিনা আর মাথায় নতুন ভুত চাপলো মাঝরাতে পাহাড়ের উপর মেঘের দলের সাথে গরম গরম চিকেন হলে খারাপ হয় না। সব কেনাকটা শেষে ঠিক ঠাক হলো এবার যাচ্ছি আমরা বান্দরবানের আলীকদম এর মারায়ন তং এর চূড়ায়।
এ পাহাড়ের নামটাই বেশ অদ্ভুত, মারায়ন তং, মারায়ন ডং, মেরাইথং কত নাম তার! নামটা শুনেই একটা অমেঘ টান অনুভব করলাম। সেই টানে টানে আমরা ৮ জন (আফনান, উচ্ছাস, আরমান, তানভীর, ছোট তানভীর, রাশেদ, বাবু, সাকিব) বের হয়ে গেলাম ৭ই নভেম্বরের রাতের বাসে ঢাকা গাবতলী থেকে চকরিয়ার উদ্দেশ্য। বাস চকরিয়া নামিয়ে দিলো সকাল ৮ টার দিকে। চকরিয়া বাস স্ট্যান্ড থেকে আলীকদম যাওয়ার জন্য চান্দের গাড়ী পাওয়া যায়। ৭০ টাকা প্রতিজনের টিকেট কেটে চেপে বসলাম চান্দের গাড়ির দিকে, গন্তব্য আলীকদম আবাসিক এলাকা চান্দের গাড়ির জানালা দিয়ে আশেপাশের পাহাড়ি ঢালের সাথে পিচঢালা পথের সখ্যতা দেখতে দেখতে প্রায় ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট পর আমরা আলীকদম আবাসিক এলাকায় পোঁছালাম। 

ততক্ষণে বেলা গড়িয়ে অনেক। এদিকে কাজ অনেক বাকি... আর্মি চেকপোস্টে নাম এন্ট্রি করাতে গিয়ে পড়লাম ভালো বিপাকে রাতে থাকার পারমশিন নাকি নেই মারায়ন তং এর চূড়ায়! অবশেষে অনেক কেচ্ছা কাহিনীর পর আমরা নিজদের রিস্কে থাকার কথা বলেরাতে বারবিকিউ করার জন্য মুরগী ,রুটি কিনে নিলাম। বেলা গড়িয়ে তখন ২ টা মাঝে জুমার নামাজ পড়ে ইয়াছিন ভাইয়ের হোটেলে দুপুরের খাবার খেয়ে ওনার পরিচিত ২ টা পিচ্চি (সাগর, মুন্না) কে নিয়ে আমরা ট্র্যাকিং শুরু করলাম মারায়ন তং এর দিকে আল্লাহর নাম নিয়ে।  

কিন্তু কপাল মন্দ থাকলে যা হয় আরকি। বেরসিক বৃষ্টি বাগড়া দিলো। মাথায় তখন চিন্তার ভাজ থাকার প্ল্যান রাতে তাবুতে, এই অবস্থায় যদি এমন বৃষ্টি হয় তাহলে কিভাবে কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না ঘুণাক্ষরেও যদি তখন জানতাম যে রাতে আমাদের জন্য কি পরিমাণ ঝড়বৃষ্টি অপেক্ষা করছে তাহলে হয়তো আর পাই বাড়াতাম না সামনের দিকে। 

ছবিঃ মারায়ান তং এর উপর থেকে চারদিকের প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য

যাক পিঠে ভারি ব্যাক প্যাক, হাতে পানির বোতল, রান্নার লাকড়ি নিয়ে সবাই আপহিল ট্র্যাক শুরু করলাম এদিকে বৃষ্টি বাড়ছে, পাহাড়ি ঢাল পিচ্ছিল হয়ে যাচ্ছে, কয়েকজন ট্যুর মেম্বার আছাড় খেলো, কয়েকজন শুয়ে গেলো ক্লান্ত হয়ে।তারপরো কার সাধ্য পাহাড়ের টান কে উপেক্ষা করার! মুখ দিয়ে ফোস ফোস শব্দ করতে করতে এগিয়ে চলছিলাম আমরা।মাঝে মুরংদের একটা পাড়া পড়লো, শক্তির জন্য খেজুর খেলাম কয়েকটা এখানে, সাগর মুন্না বললো পাশেই নাকি ছোট একটা পানির ছড়া আছে, ওখানে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে মুরগি গুলো রান্নার জন্য ধুয়ে নিলাম। তারপর, আবার হাটা শুরু………… 

হাটছি তো হাটছি……সোজা ৬০ ডিগ্রী খাড়া রুট ধরে এগিয়ে চলছি আর পায়ের ধৈর্যের পরিক্ষা নিচ্ছি। কিন্তু চূড়ার কাছাকাছি এসেই পেছনে তাকাতেই সব কষ্ট ভুলে গেলাম মুখ ফুটেই বেরিয়ে এলো আল্লাহ্‌, এতো সুন্দর তোমার সৃষ্টি!! 

মেঘ গুলো আস্তে করে আমাদের শরীর ছুয়ে যাচ্ছে। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ওইতো চূড়া দেখা যায় মহামান্য মারায়ন তং এর পায়ে কিছুটা গতি বাড়িয়ে উঠে গেলাম চূড়ায়। ধপাস করে বসে গেলাম সব ফেলে মাটিতে। উচ্ছাস তো একেবারে শুয়েই গেলো চিত পটাং হয়ে। এদিকে সময় গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা পাহাড়ে রাত একটু তাড়াতাড়িই নামে। চূড়ার ডান পাশটা কিছুটা সমতল হওয়ায় ওখানেই তাবু ফেলব বলে মনস্থির করলাম। সাগর আর মুন্না ঝটপট করে তাবু গেড়ে ফেললো মজাখানে বাতাস আঁটকে আগুন জালানোর জন্য একটা যায়গা বানানো হলো। পাহাড়ি সন্ধ্যার হিমশীতল বাতাস শরীর জুড়ীয়ে দিয়ে যাচ্ছিলো। তখনি ফোনে বাসা থেকে দুঃসংবাদ পেলাম ঘূর্ণিঝড় বুলবুল নাকি এগিয়ে আসছে। ১০ নম্বর বিপদ সংকেত দেয়া হয়েছে চট্রগ্রাম অঞ্চলে জনমানবহীন এই পাহাড়ি অঞ্চলে রাতে যদি আমাদের ৮ জনের উপর ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে তবে কারো কাছ থেকেই কোন সাহায্য পাওয়া যাবে না, তা নিশ্চিত ভয় পেলেও মনে মনে সবাইকে সাহস দিয়ে আগুন ধরিয়ে ফেলা হলো। তড়িঘড়ি করে মুরগি গুলো তে মশলা মাখিয়ে শিকে তুলে দেয়া হলো। এর মাঝে কয়েকবার বৃষ্টি হানা দিলো।টিপ টিপ বৃষ্টির হিম ঠান্ডার মাঝে আমরা আমাদের বারবিকিউ সম্পন্ন করলাম। রাতের অন্ধকারে তেমন কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না আশপাশে। কিন্তু আমরা যে তখন একদম মেঘের চাদরে ঢাকা সেটা দিব্যি অনুভব করতে পারছিলাম। এ এক অদ্ভুত পরিবেশ, চারপাশ মেঘে ঢাকা, ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে তীব্র বাতাসকে উপেক্ষা করে ৮ জন মানুষ আগুনের কুণ্ডলীর পাশে জড়ো হয়ে জীবনের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা নিচ্ছে!  
 

খাওয়া-দাওয়া শেষে ৮ জন ৩ টা তাবুতে ঢুকে পড়লাম। শরীর প্রচন্ড ক্লান্ত, শোয়া মাত্রই তাবুতে ঘুম। ঘুমের অতল গহ্বর থেকেও মাঝে মাঝে পাহাড়ি বাতাসের দাপট টের পাচ্ছিলাম। এদিকে রাত গড়িয়ে মাঝ রাত। 
হটাত করেই তীব্র বাতাসের শনশন শব্দ আর বৃষ্টির বড় বড় ফোটা তাবু ছেদ করে আমাদের প্রায় আধা ভিজিয়ে দিয়েছে। তাবু চুইয়ে ভেতরে পানি ঢুকছে, বাহিরে ঝড়ো বাতাস। বুঝলাম ঝড়ের কবলে পড়তে যাচ্ছি। আল্লাহর নাম নিয়ে সবাই তাবু থেকে বেরিয়ে তাবু গুলির খুটি শক্ত করে মাটিতে পুঁতলাম। তাবুর পানি কিছুটা মুছে চুপ চাপ বসে থাকলাম সবাই, কেবল ভাবছিলাম প্রকৃতি কত ভয়ংকর সুন্দর সেটা আজ মারায়ন তং এর চূড়ায় না থাকলে জীবনে হয়তো টেরি পেতাম না।  

পাহাড়ের আবহাওয়া মেয়েদের মন থেকেও বিচিত্র। হুট করে ঝড় শেষ, বাতাস কমে গেলো, আকাশ ছেদ করে উকি দিলো চাঁদমামা আর অজস্র তাঁরা। তাবুর জানালা দিয়ে উকি দিয়ে যখন এ দৃশ্য দেখলাম তখন তো সবার চক্ষুচড়কগাছ, আরেকবার শুকরিয়া আদায় করে তাবু থেকে বের হয়ে রাতের পাহাড়ি পরিবেশ উপভোগ করতে লাগলাম। কি নিস্তব, বাতাসের শো শো শব্দ, সবকিছু কেমন জীবন্ত মনে হয়!তখনো দেখলাম আমাদের আগুনের যায়গাটাতে কিছু শিখা জলছিলো, কয়েকবারের চেষ্টায় আগুন ধরিয়ে ফেলা হলো। 

রাত তখন ৪.৩০, ঠান্ডায় কাপতে কাপতে আগুন ঘিরে আমাদের ৮ জন মানুষের মুড়িভোজ পর্ব শুরু হলো। গরম আগুনের পাশে ঝাল ঝাল মুড়ি কে তখন স্বর্গীয় খাবার মনে হচ্ছিলো। মুড়ি পর্ব শেষ হতে না হতেই আরেকদফা বৃষ্টি শুরু হলো। বেরসিক বৃষ্টি থেকে বাঁচতে আবার আমরা তাবুর ভেতর ঢুকে কোন মতে রাত পার করলাম। 

ছবিঃ মারায়ান তং যাত্রায় আমাদের স্বপ্নঘুড়ি টিম

মারায়ং তং এর চূড়ায় সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হচ্ছে ভোরের আলো ফোটা সকাল। গা জুড়ানো বাতাসের মাঝে হালকা রোদের কিরণ যখন গাঁয়ে পড়ে আর চোখ খুলে আশে পাশের পাহাড়ের, জনজীবনের দৃশ্য যখন চোখে পড়ে নিজেকে তখন মনে হবে আপনি অন্য জগতে বাস করছেন, মনে হবে আপনি এ পাহাড়ের সৌন্দর্যেরি একটা অংশ।   

এভাবে আরো কিছুটা সময় আমরা মারায়ন তং এর চূড়ায় কাটিয়ে পাহাড়ের নেশা ভুলে সমতলের দিকে রওনা দিলাম। আশার সময় পাহাড়ে রেখে আসলাম কেবল আমাদের পদচিহ্ন আর বৃষ্টির সাথে যুদ্ধ করে কাটানো জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ এক রজনী। 

মারায়ন তং যেভাবে যাবেনঃ  

ঢাকা থেকে আলীকদমের সরাসরি বাস আছে এখন। হানিফ ও শ্যামলি পরিবহ্নের ২ টি বাস রাত ১১ টার দিকে গাবতলী থেকে ছেড়ে যায় আলীকদমের উদ্দেশ্যে। ভাড়া ৮৫০ টাকা প্রতি সিট।বাসের সুপারভাইজার কে আগে থেকেই বলে রাখবেন আলীকদম মেইন বাস স্ট্যান্ডের আগে আবাসিক নামক এলাকায় আপনাদেরকে নামিয়ে দিতে। আবাসিক নেমে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই মারায়ন তং যাওয়ার রাস্তা দেখিয়ে দিবে। সেক্ষেত্রে ইয়াছিন ভাইয়ের হোতেল থেকে ইয়াছিন ভাইয়ের সাহায্য নিতে পারেন। কিছু বকশিশের বিনিময়ে ছোট ছোট ছেলেদের সাথে নিয়ে যেতে পারেন। আমরা ২ জনকে নিয়ে গিয়েছিলাম, ৫০০ টাকা দিয়েছিলাম ২ জনকে।  

আর যদি ডিরেক্ট বাসের টিকেট না পান তাহলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী বাসে উঠে চকোরিয়া তে নেমে যাবেন। ৭৫০ টাকা বাস ভাড়া নিবে। চকোরিয়া থেকে আলীকদমের চান্দের গাড়ি বা জীপ পাওয়া যায়, সিট প্রতি ৭০ টাকা করে নিবে। ২ ঘন্টার মাঝে চান্দের গাড়ি আপনাকে আলীকদম আবাসিক এলাকায় নামিয়ে দিবে। ড্রাইভার কে বলে রাখবেন আবাসিকে নামিয়ে দিতে।  

এভাবেই আপনারা চলে যেতে পারেন আলীকদম হয়ে মারায়ন তং এ । 

মারায়ন তং এ যাওয়ার টিপসঃ 

  • চূড়ায় রাত্রি যাপনের ইচ্ছা থাকলে অবশ্যই ভালোমানের ওয়াটারপ্রুফ তাবু নিয়ে যাবেন। 
  • সাথে বহন করা ব্যাগ যতটা সম্ভব হালকা রাখবেন। 
  • দল আকারে যাবেন। ৫-৬ জনের দল হলে ভালো হয়। 
  • মারায়ন তং এর ট্রাকিং রুট পুরোটাই খাড়া, তাই উঠতে গিয়ে তাড়াহুড়ো করবেন না, আস্তে আস্তে বিরতি দিয়ে উঠবেন, সাথে প্রচুর পানি, স্যালাইন, গ্লুকোজ, খেজুর, শুকনো খাবার নিয়ে যাবেন। 
  • বিকাল ৪ টার আগে চূড়ায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন।  

সাথে মেয়ে মেম্বার না নিয়ে যাওয়াই ভালো। পাহাড়িরা ছেলে মেয়ে এক্সাথের দল ভালোভাবে নেয় না। আর সেনাবাহিনীও অনুমতি দিতে অনীহা প্রকাশ করে। পাহাড়িদের সাথে ভালো ব্যাবহার করবেন।সবশেষে আকুল আবেদন থাকবে দয়া করে পাহাড় ময়লা করবেন না পলিথিন বা আপনার ব্যবহার করা উচ্ছিষ্ট ফেলে। ময়লা দেখলেও সেগুলো পরিষ্কার করে দিয়ে আসাই উদার মনের পরিচয় দিবে। প্রকৃতির এ সৌন্দর্য আমাদের কাছে আমানত সরূপ, আমরা আমাদের আমানত সঠিক ভাবে হেফাযত করবো। ধন্যবাদ সবাইকে ধৈর্য ধরে লিখাটি পড়ার জন্য। আশা করি লেখাটি আপনাদের ভালো লেগেছে এবং আপনাদের ভ্রমণে এটি কাজে লাগবে। 

স্বপ্নঘুড়ি টিমের মারায়ন তং ট্যুরের ভিডিও দেখতে ঘুরে আসুন আমাদের ইউটিউব চ্যানেল থেকে -

আশা করি ভিডিও থেকে আপনিও অনুপ্রাণিত হবেন পাহাড়ের ডাকে সাড়া দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে মারায়ং তং এর দিকে পথ চলায়।