Friday 19 January

‘বিটকয়েন’ দ্যা কিউরাস কেস অব ক্রিপ্টোকারেন্সি

বর্তমান আর্থিক ব্যবস্থা

প্রাচীন আমলের পণ্য বিনিময় ব্যবস্থায় নানা ধরনের ঝামেলা থেকেই সবাই ভেবে দেখলেন, একটা এমন কিছু দরকার যেটির মূল্য সকলের কাছে রয়েছে- যেমন, স্বর্ণ। এভাবে সেই অনেক বছর আগে থেকে স্বর্ণ সম্পদ পরিমাপের একক ও বিনিময় মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার হয় । সময়ের হাত ধরে একসময় কাগজের মুদ্রা ব্যবস্থা চালু  হয় । পর্যায়ক্রমে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন বা সম্পদের আদান-প্রদান সংক্রান্ত ব্যাপারগুলো সামলানোর জন্য তৈরি হয় ব্যাংক বা ব্যাংকিং সিস্টেম ।

তথ্যপ্রযু্ক্তির উন্নয়নে এখন আমরা এমন একটা সিস্টেমের কথা ভাবছি যেখানে, সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাংকের চাইতে আরও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ বা আর্থিক মূল্য আছে এমন যে কোনো সম্পদের সরাসরি লেনদেন হবে । কোনো প্রকার হ্যাকিং, তথ্য চুরি বা পরিবর্তন, সোজা কোথায় কোনো প্রকার দুই নাম্বারি যে সিস্টেমে প্রায় অসম্ভব ।

এই প্রযুক্তির নাম হল ব্লকচেইন, যাকে বর্তমানে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তিবিদ ভবিষ্যতের ব্যাংকিং টেকনোলজি হিসেবে দেখছেন এবং কিছু প্রভাবশালী দেশের কয়েকটি ব্যাংক ইতোমধ্যে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এ প্রযুক্তির পেছনে । ব্লকচেইন সিস্টেম এবং সেটার জন্য প্রথম ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন ডিজাইন ও ডেভেলপ করেন যিনি তার নাম সাতোশি নাকামোতো । ‘যিনি’ কথাটা এখানে সম্ভবত ঠিক নয়, অনুমান করা হয় সাতোশি নাকামোতো হচ্ছে একদল হ্যাকারের কোডনেম যাদের আসল পরিচয় এখন পর্যন্ত অনিশ্চিত ।

ব্লকচেইন কী?

ব্লকচেইন হল একটি মোটামুটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিশ্বজুড়ে যত আর্থিক বা সম্পদের লেনদেন হচ্ছে সেগুলোর এনক্রিপটেড তথ্য এক সঙ্গে করে একটা ব্লক বানিয়ে তথ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা । এ ব্যবস্থায় ওই ব্লক দিয়ে ক্রমানুসারে সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় একটা ডিস্ট্রিবিউটেড ও ডিসেন্ট্রালাইজড লেজার ।

এটা আসলে এক বাক্যে বোঝার জন্য একটু কঠিন বিষয় । এজন্য একটু বিস্তারিত ভাবে বলার চেষ্টা করছি । আমার লেখায় আমি যে ব্লকচেইনের কথা বলছি সেটা হলো বিটকয়েন ব্লকচেইন । আরও অনেক কাজের জন্য অনেক রকম ব্লকচেইন আছে ।

  • প্রত্যেকটা ব্লকের ভিতর থাকে আনুমানিক সর্বশেষ ১০ মিনিটের মধ্যে বিশ্বে যত লেনদেন হয়েছে সেটার সকল ডেটা । এই ডেটা ওপেন কিন্তু এনক্রিপ্টেড অর্থাৎ সবাই দেখতে পারবে কিন্তু পড়তে গেলে প্রাইভেট ‘KEY’ লাগবে ।মানুষ যেটা দেখবে তা হলো লেনদেনের পরিমাণ । কার অর্থ কার কাছে গিয়েছে সেটা এভাবে জানা যাবে না । নিচের ছবিতে দেখা যাবে একটা লেনদেন দেখতে কেমন ।

  • ব্লকচেইনের প্রত্যেকটা ব্লক সম্পূর্ণ অপরিবর্তনীয় । একবার চেইনে একটা ব্লক যোগ হয়ে গেলে সেটাতে কোন প্রকারের পরিবর্তন অসম্ভব ।
  • ব্লকগুলো পাশাপাশি তাদের সৃষ্টির ক্রমানুসারে বসে। প্রত্যেকটা ব্লক তার আগে কোন ব্লক আছ সেটা জানে। এভাবে একটা ব্লকের সঙ্গে আরেকটা কানেক্টেড ।

ক্রিপ্টোকারেন্সি

আমাদের প্রচলিত মুদ্রার মতো ক্রিপ্টোকারেন্সিও এক প্রকার মুদ্রা বা অনলাইন  বিনিময় মাধ্যম । ব্লকচেইনের মাধ্যমে লেনদেনের জন্য এ ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করা হয়। এই রকম মুদ্রা অনেক আছে, যেমন বিটকয়েনবিটক্যাশমোনেরোলাইটকয়েন  ইত্যাদি। বর্তমানে সবচেয়ে পরিচিত ও চাঞ্চল্য তৈরি করা ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো বিটকয়েন । এ ভার্চুয়াল মুদ্রার দাম যেন রকেটের গতি পেয়েছে । এক বছরের মধ্যে প্রতিটির দাম এক হাজার ডলার থেকে বেড়েছে প্রায় ১৭ গুণ । এক মাসের মধ্যে কয়েকগুণ বেড়ে প্রতিটি বিটকয়েনের দাম উঠেছিল ১৭ হাজার ডলার পর্যন্ত । তবে স্বল্প সময় পরেই তা দরপতনে রূপ নেয় । নেমে যায় সাড়ে ১১ হাজার ডলারে ।

কিভাবে বিটকয়েন তৈরি হয়?

প্রচলিত সকল মুদ্রার নিয়ন্ত্রক হলো কোনো দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক । কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেশের অর্থনীতি এবং আরও অন্যান্য কিছু বিষয় বিবেচনা করে নতুন কারেন্সি তৈরি করতে পারে । সোজা বাংলায় নতুন ‘নোট’ ছাপতে পারে ।

অন্যদিকে ক্রিপ্টোকারেন্সি সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে তৈরি হয় । এখানে নতুন কারেন্সি বা বিটকয়েন আসে প্রতি ১০ মিনিটে একটি ক্রিপ্টোগ্রাফিক পাজল সমাধান করার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে । সহজ করে বলি, শুধু একটু মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে এখানে ।

যারা এনক্রিপশান সম্পর্কে জানে, তাদের কাছে SHA256 এনক্রিপশান পরিচিত হওয়ার কথা । যারা পরিচিত না, এটুকু জানলেই হবে-যে কোনো ডেটাকে SHA256-এ যদি এনক্রিপ্ট করা হয় তাহলে ওই ডেটার জন্য একটা হ্যাশ পাওয়া যায় । হ্যাশ হলো বোঝার সুবিধার্থে, “000001beeca3785d515897041af0a7”- এ রকম কিছু একটা বস্তু । এখন এই ডেটা থেকে যদি অতি সামান্য কোনো কিছুও পরিবর্তন হয়, তাহলে একটি ভিন্ন হ্যাশ পাওয়া যাবে । অর্থাৎ এভাবে এনক্রিপ্ট করলে নির্দিষ্ট একটা ডেটার জন্য হ্যাশ সর্বদা একই হবে এবং সবার কম্পিউটারেই একই হবে । 

প্রতি মুহূর্তে বিশ্বে বিটকয়েনের ব্লকচেইনে অসংখ্য লেনদেন চলছে । ব্লকচেইনে নতুন একটা ব্লক যোগ হওয়ার পর থেকে আনুমানিক১০ মিনিট ধরে পেন্ডিং ট্রানজেকশনের ডেটা বিটকয়েন সিস্টেমের সকল মাইনারদের কম্পিউটারে জমতে থাকে । মাইনার আবার কি?

বোঝার জন্য ধরে নিই, মাইনার মানে আমরা নিজেরা যারা কম্পিউটার নিয়ে বসে আছি পাজল সমাধানের জন্য । এখন আমাদের বা মাইনারদের টার্গেট হলো, যে ডেটা আমাদের কাছে এই মুহূর্তে আছে সেটা, আগের ব্লকের হ্যাশ এবং তার সঙ্গে আরেকটা Random Number (এখানে একে Nonce = Number Used Once বলা হয়) মিলিয়ে উপরের মতো শুরুতে ৫টা জিরো আছে এ রকম প্যাটার্নের একটা হ্যাশ খুঁজে বের করা ।

৫টা জিরো কেন ? এটাকে বলা হয়, ডিফিকাল্টি লেভেল, অর্থাৎ শুরুতে কয়টা জিরো বসবে সেটা আসলে পাজলটা সমাধান করা কতো কঠিন সেটা নির্দেশ করে ।

এভাবে মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীতে হাজার হাজার মাইনার তাদের কম্পিউটারে সেই কাঙ্ক্ষিত হ্যাশ খুঁজে বের করার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে । এ প্রসেস আসলে কোনো বিশেষ অ্যালগরিদম বা বুদ্ধি দিয়ে জেতা যাবে না । একেবারে বাংলা পদ্ধতিতে একটার পর একটা Nonce প্রয়োগ করে চেক করতে হবে সেই প্যাটার্নের হ্যাশ পাওয়া গেল কিনা ।

এই প্রতিযোগিতায় যে মাইনার সবার আগে এই হ্যাশ খুঁজে বের করতে পারে সে চ্যাম্পিয়ন। হ্যাশ খুঁজে পাওয়া মানে হল, নতুন একটা ব্লকচেইনের জন্য নতুন একটা ব্লক তৈরি হওয়া । চমৎকার না? চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পুরস্কার হিসাবে বিজয়ী মাইনার পায় বর্তমানে ১২.৫বিটকয়েন ।

তাহলে বাকিরা? বাকি মাইনার যারা জিততে পারলো না তারাও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের হ্যাশ পেয়ে যাবে । তাদের কাজ হল, বিজয়ী মাইনারের রেজাল্ট সঠিক কিনা সেটা ভেরিফাই করা । এভাবে সম্ভবত ৫১.৭% মাইনার ভেরিফাই করে দিলে তখন, নতুন ব্লকটা একটা পরীক্ষিত ব্লক হিসাবে ব্লকচেইনে যোগ হয়ে যায়।

কেউ বিটকয়েন কিনতে চাইলে সে মাইনারদের থেকে সরাসরি কিনতে পারে কিংবা বিটকয়েন কেনাবেচার সাইট আছে সেখান থেকেও কিনতে পারে।

ব্লকচেইনের নিরাপত্তা

হ্যাকিং থেকে সুরক্ষা - আগেই বলেছি ব্লকচেইনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, একটা ব্লক ব্লকচেইনে যোগ হয়েছে এর অর্থ হল, ওই ব্লক সম্পূর্ণরূপে অপরিবর্তনীয় । কোনভাবেই ব্লকে কোনো পরিবর্তন সম্ভব    নয় । অর্থাৎ হ্যাক করা মোটামুটি অসম্ভব । কেন অসম্ভব?কারণটা মজার । প্রথমত, একটা ব্লকের ভিতর অনেকগুলো ট্রানজেকশন রেকর্ড থাকে । এগুলো সবই এনক্রিপ্ট করা ডেটা । অর্থাৎ প্রাইভেট কী ছাড়া কোনো একটা ট্রানজেকশনের ভিতরকার ডেটা পড়া একদমই অসম্ভব ।

ডেটার নিরাপত্তা

ব্লকচেইনে ট্রানজেকশন ডেটা পুরোপুরি নিরাপদ বলা যায় । একটা ব্যাংকের ব্যাংকিং সফটওয়ার এক বা একাধিক সার্ভারে থাকতে পারে । এজন্য হ্যাকার যদি ওই সার্ভার হ্যাক করতে পারে তাহলেই ব্যাংক বিপদে পড়ে যাবে, কাস্টমার যারা আছেন তারাও চরম বিপদে পড়বেন । কিন্তু ব্লকচেইন হল ডিস্ট্রিবিউটেড ও ডিসেন্ট্রালাইজড । অর্থাৎ, একই ডেটাসহ পুরো ব্লকচেইন পৃথিবীতে হাজার হাজার ডেটা সেন্টার, কম্পিউটারে আছে । এর মধ্যে একটা বাদে সব ধ্বংস হয়ে গেলেও সিস্টেম চলবে, এটা আসলে বাস্তবে সম্ভব নয় । সম্ভব হতে হলে পুরো পৃথিবীতে ইন্টারনেটকেই ডাউন করতে হবে । এর পুরো ডেটাই এনক্রিপ্টেড, কাজেই ডেটার নিরাপত্তা নিয়ে কোনই সংশয় নেই । 

সপ্নঘুড়ির সাথে থাকার জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ । আমাদের পোস্ট গুলো যদি ভালো লেগে থাকে বা ইনফরমেটিভ হয় তাহলে প্লিজ শেয়ার করুন আপনার বন্ধু দের সাথে । স্বপ্ন দেখুন, স্বপ্ন নিয়েই বাচুন, অন্যের স্বপ্ন কে উৎসাহ দিন ।